স্বাধীনতা সংগ্রাম, পশ্চিমবঙ্গের জন্ম, শিল্প ও শিক্ষা—ইতিহাসের একাধিক অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এ বার আরও সরাসরি ঢুকতে চলেছেন রাজ্যের পাঠ্যক্রমে। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়—শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে তাঁর দেশ ও বাংলার জন্য অবদান, চিন্তাভাবনা এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম শিল্পমন্ত্রী হিসাবে তাঁর কাজ পড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই ধাপে ধাপে এই উদ্যোগ কার্যকর করার কথা জানানো হয়েছে।
শ্যামাপ্রসাদের ১২৫তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বছরভর নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে রাজ্য। সেই কর্মসূচির রূপরেখা চূড়ান্ত করতে নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সভাপতিত্বে উচ্চ পর্যায়ের কমিটির বৈঠক হয়। বৈঠকে রাজ্যের মন্ত্রী, বিধায়ক, মুখ্যসচিব, কেন্দ্রীয় সরকারের আধিকারিক এবং শ্যামাপ্রসাদের স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। দীর্ঘ বৈঠকে পাঠ্যক্রম ছাড়াও তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণ এবং জন্মজয়ন্তী উদ্যাপন ঘিরে একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পাঠ্যক্রমে শ্যামাপ্রসাদকে অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমান এবং আগামী প্রজন্মের কাছে দেশের ও পশ্চিমবঙ্গের জন্য তাঁর অবদান পৌঁছে দেওয়াই এই উদ্যোগের লক্ষ্য। একই সঙ্গে স্বাধীন ভারতের প্রথম শিল্পমন্ত্রী হিসাবে তাঁর উন্নয়নমুখী চিন্তাভাবনা ও গঠনমূলক কাজও পড়ুয়াদের জানানো হবে। অর্থাৎ শুধু রাজনৈতিক নেতা হিসাবে নয়, শিক্ষাবিদ, প্রশাসক, শিল্পনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এবং জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসাবে শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা পাঠ্যক্রমে তুলে ধরার পরিকল্পনা করছে সরকার। তবে কোন শ্রেণির কোন বইয়ে কতটা অংশ থাকবে, সেই বিস্তারিত কাঠামো এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি ১২৫ ফুটের মূর্তি
শ্যামাপ্রসাদের স্মৃতি ধরে রাখতে নিউটাউনের ইকো পার্কে তৈরি হচ্ছে ১২৫ ফুটের একটি দণ্ডায়মান মূর্তি। ইতিমধ্যেই তার ভূমিপুজো হয়েছে। বৈঠকে হিডকোর তরফে মূর্তি ও সংশ্লিষ্ট পরিকাঠামোর পূর্ণাঙ্গ নকশা ও পরিকল্পনাও দেখানো হয়। শুধু মূর্তি নয়, সেখানে একটি আধুনিক সংগ্রহশালা তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। লক্ষ্য, শ্যামাপ্রসাদের জীবন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষা ও শিল্পক্ষেত্রে ভূমিকা এবং তাঁর সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলিকে এক জায়গায় তুলে ধরা। দ্রুত কাজ শেষ করে আগামী ৬ জুলাইয়ের মধ্যে মূর্তির উদ্বোধনের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে বলে সরকার জানিয়েছে।
জিরাটের পৈতৃক ভিটেতেও সংস্কার
শ্যামাপ্রসাদের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত হুগলির জিরাটও এ বার সংরক্ষণের আওতায় আসছে। তাঁর পৈতৃক ভিটে ঘিরে ইতিমধ্যেই ৩০ ডেসিমেল জমি কেনা হয়েছে বলে সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে। সেখানে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের নামাঙ্কিত গ্রন্থাগারের আধুনিকীকরণ এবং নতুন সংগ্রহশালা তৈরির প্রস্তাবেও অনুমোদন দিয়েছে কমিটি। ফলে জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে শুধু অনুষ্ঠান নয়, স্থায়ী স্মৃতিচিহ্ন তৈরির দিকেও জোর দিতে চাইছে সরকার।
বই, পোর্টাল, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ
১২৫তম জন্মজয়ন্তীকে সামনে রেখে একাধিক বই প্রকাশেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলা ও ইংরেজিতে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবন ও কর্ম নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ পুস্তিকা প্রকাশের পরিকল্পনা করেছে জনশিক্ষা ও গ্রন্থাগার দফতর। এ ছাড়াও রামকৃষ্ণ মিশনের একটি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে প্রস্তুত করা একটি বই প্রাক্তন রাজ্যপাল তথাগত রায়ের উদ্যোগে কমিটির পক্ষ থেকে যৌথ ভাবে প্রকাশ করার পরিকল্পনা রয়েছে। সাধারণ মানুষকেও এই বর্ষব্যাপী কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের উদ্যোগে একটি পোর্টাল চালু হবে। সেখানে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান শ্যামাপ্রসাদের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং জন্মজয়ন্তী উদ্যাপন নিয়ে নিজেদের মতামত ও প্রস্তাব জানাতে পারবেন।
কেন এত গুরুত্ব শ্যামাপ্রসাদকে?
বাংলার রাজনীতির ইতিহাসে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক ও আলোচনার কেন্দ্রে। শিক্ষাবিদ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পুত্র শ্যামাপ্রসাদ অল্প বয়সেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত হন। পরে স্বাধীন ভারতের প্রথম মন্ত্রিসভায় শিল্প ও সরবরাহ মন্ত্রকের দায়িত্ব পান। পরবর্তী সময়ে ভারতীয় জনসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও তাঁর নাম অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িয়ে যায়।
পশ্চিমবঙ্গের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নেও তাঁর ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক ইতিহাসে বিস্তর আলোচনা রয়েছে। দেশভাগের সময়ে বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর অবস্থান, কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের অংশ হিসাবে রাখার দাবি এবং পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তাঁকে বাংলার ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে পরিণত করেছে। অন্য দিকে, তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ, জাতীয়তাবাদ এবং কাশ্মীর প্রশ্নে অবস্থানও ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৫৩ সালে জম্মু ও কাশ্মীরে বন্দি অবস্থায় তাঁর মৃত্যু আজও রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়। সেই কারণে পাঠ্যক্রমে তাঁর অন্তর্ভুক্তি নিছক কোনও ব্যক্তির জীবনী সংযোজন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাসকে কী ভাবে পরবর্তী প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা হবে, সেই বড় প্রশ্নও।
‘দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদ, রাষ্ট্র সর্বাগ্রে’
জন্মজয়ন্তী উদ্যাপনের মূল ভাবনার কথা বলতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, স্বাধীনতা আন্দোলনে শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা, পশ্চিমবঙ্গ গঠনে তাঁর অবদান এবং তাঁর চিন্তাভাবনার বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। সরকারের বক্তব্য, দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদ, রাষ্ট্রকে সর্বাগ্রে রাখা এবং ‘এক ভারত শ্রেষ্ঠ ভারত’-এর ভাবনার সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদের চিন্তাভাবনার যোগসূত্রও পড়ুয়াদের সামনে তুলে ধরা হবে।
তবে এখানেই শিক্ষাবিদদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে পাঠের ভারসাম্য। শ্যামাপ্রসাদের অবদান যেমন আলোচিত হবে, তেমনই তাঁর রাজনৈতিক মত, সমকালীন বিতর্ক এবং তাঁর সময়ের বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট কতটা তথ্যনিষ্ঠ ভাবে তুলে ধরা হয়, তা নিয়েও নজর থাকবে। কারণ ইতিহাসের পাঠ শুধু শ্রদ্ধার নয়, প্রশ্ন করারও। কোনও ব্যক্তিত্বকে জানতে হলে তাঁর কৃতিত্বের পাশাপাশি তাঁর সময়, মতাদর্শ, বিরোধিতা এবং বিতর্ক—সবকিছুকেই জানা জরুরি।
এ বার সেই ইতিহাসই পৌঁছবে শ্রেণিকক্ষে। ১২৫তম জন্মজয়ন্তীর বছরে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তাই শুধু স্মৃতির মূর্তি বা সংগ্রহশালায় নয়, ঢুকছেন পাঠ্যবইয়ের পাতাতেও। আগামী প্রজন্ম তাঁকে কী ভাবে জানবে, সেই গল্পের প্রথম অধ্যায় লেখা শুরু হচ্ছে আগামী শিক্ষাবর্ষে।