এয়ারপোর্টে বিমানে ওঠার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা এক যাত্রী হঠাৎ মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। স্কুলের প্রার্থনা সভায় আচমকাই অজ্ঞান হয়ে গেলেন এক শিক্ষক। শপিং মলে কেনাকাটা করতে গিয়ে আচমকা মাটিতে পড়ে গেলেন এক ব্যক্তি। এমন পরিস্থিতিতে চারপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কেউ জল খুঁজতে ছোটেন, কেউ অ্যাম্বুল্যান্স ডাকেন। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, এই কয়েক মিনিটেই নির্ধারিত হয়ে যেতে পারে একজন মানুষের জীবন-মৃত্যু।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, দেশের প্রতিটি স্কুল, শপিং মল, বিমানবন্দর, রেলস্টেশন, স্টেডিয়াম, অফিস এবং জনবহুল স্থানে অটোমেটেড এক্সটার্নাল ডিফিব্রিলেটর (AED) এবং CPR (কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন)-এ প্রশিক্ষিত কর্মী থাকলে আকস্মিক হৃদ্রোগজনিত মৃত্যুর সংখ্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
হার্ট অ্যাটাক আর কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট এক নয়
অনেকেই হার্ট অ্যাটাক এবং সাডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্টকে একই সমস্যা বলে মনে করেন। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় দু'টির মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। হার্ট অ্যাটাক হয় যখন হৃদ্যন্ত্রের কোনও অংশে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সেই অবস্থায় হৃদ্যন্ত্র সাধারণত কাজ করতে থাকে, যদিও দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।
অন্যদিকে সাডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হল হৃদ্যন্ত্রের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপের সমস্যা। আচমকা হৃদ্স্পন্দন কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মস্তিষ্ক ও শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলিতে রক্ত পৌঁছনো বন্ধ হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে CPR ও ডিফিব্রিলেটরের সাহায্য না পেলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই মৃত্যু হতে পারে।
ফরিদাবাদের সর্বোদয় হাসপাতালের ইন্টারভেনশনাল কার্ডিয়োলজি বিভাগের প্রধান ডা. অরবিন্দ ডাম্বলকর বলেন, "সাডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বিশ্বজুড়ে আকস্মিক মৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ। এই পরিস্থিতিতে হাসপাতালে পৌঁছনোর আগেই যদি সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া যায়, অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।"
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ প্রথম কয়েক মিনিট?
চিকিৎসকদের ভাষায়, কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের পর প্রথম কয়েক মিনিটই হল 'গোল্ডেন মিনিটস'। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, CPR এবং ডিফিব্রিলেশন ছাড়া প্রতি মিনিট দেরি হলে রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ৭ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। অর্থাৎ অ্যাম্বুল্যান্স আসার অপেক্ষা করলেই চলবে না। আশপাশে থাকা সাধারণ মানুষকেই প্রথমে এগিয়ে আসতে হবে।
AED কী? সাধারণ মানুষও কি ব্যবহার করতে পারবেন?
অনেকের ধারণা, ডিফিব্রিলেটর শুধুই হাসপাতালের চিকিৎসকদের ব্যবহারের যন্ত্র। বাস্তবে বিষয়টি ঠিক উল্টো।
Automated External Defibrillator (AED) এমন একটি বহনযোগ্য যন্ত্র, যা রোগীর হৃদ্স্পন্দন পরীক্ষা করে প্রয়োজন হলে স্বয়ংক্রিয় ভাবে বৈদ্যুতিক শক দেয়। আধুনিক AED-তে ধাপে ধাপে ভয়েস নির্দেশ থাকে। ফলে চিকিৎসা সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা না থাকলেও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সাধারণ মানুষও এটি ব্যবহার করতে পারেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, হৃদ্যন্ত্রের ছন্দ উপযুক্ত না হলে এই যন্ত্র কোনও ভাবেই শক দেয় না। ফলে ভুল করে বিপদ বাড়ার আশঙ্কা অত্যন্ত কম।
কেন স্কুলে AED থাকা জরুরি?
কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট শিশুদের মধ্যে তুলনামূলক বিরল হলেও একেবারে অসম্ভব নয়। জন্মগত হৃদ্রোগ বা অজানা শারীরিক সমস্যার কারণে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। পাশাপাশি স্কুলে প্রতিদিন শত শত শিক্ষক, কর্মী, অভিভাবক এবং দর্শনার্থীও আসেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি স্কুলে—
- সহজে দেখা যায় এমন জায়গায় AED রাখতে হবে।
- শিক্ষক, বিশেষ করে শারীরশিক্ষার শিক্ষকদের CPR প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
- নিরাপত্তারক্ষী ও প্রশাসনিক কর্মীদের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
- নিয়মিত মক ড্রিলের ব্যবস্থা করতে হবে।
মল, বিমানবন্দর ও রেলস্টেশনে ঝুঁকি বেশি কেন?
এই ধরনের জায়গায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের ভিড় হয়। বয়স্ক মানুষ, দীর্ঘদিনের রোগী, ভ্রমণের চাপে থাকা যাত্রী— সকলেই থাকেন সেখানে। ভিড়ের মধ্যে রোগীকে খুঁজে বের করতে এবং অ্যাম্বুল্যান্স পৌঁছতে অনেক সময় লেগে যায়। তাই ঘটনাস্থলেই যদি CPR-প্রশিক্ষিত কর্মী এবং AED থাকে, তা হলে মূল্যবান কয়েক মিনিট নষ্ট হয় না।
শুধু যন্ত্র কিনলেই হবে না
চিকিৎসকদের মতে, AED বসিয়ে রাখাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন—
- নিয়মিত CPR প্রশিক্ষণ,
- জরুরি পরিস্থিতির মহড়া,
- AED-র রক্ষণাবেক্ষণ,
- সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি।
কর্মীদের জানতে হবে কী ভাবে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট চিনতে হয়, কী ভাবে জরুরি পরিষেবাকে খবর দিতে হয়, কী ভাবে বুকে চাপ দিয়ে CPR শুরু করতে হয় এবং কখন AED ব্যবহার করতে হবে।
ভারতের সামনে বড় সুযোগ
বিশ্বের বহু দেশে স্কুল, বিমানবন্দর, রেলস্টেশন ও স্টেডিয়ামে AED রাখা এবং সাধারণ মানুষকে CPR শেখানো এখন জননিরাপত্তার বাধ্যতামূলক অংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতেও জনবহুল এলাকায় AED ও CPR-প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা গেলে হাসপাতালের বাইরে হওয়া কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে মৃত্যুর হার অনেকটাই কমানো সম্ভব।
ডা. ডাম্বলকরের কথায়, “যে ভাবে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র বা জরুরি নির্গমন পথকে জননিরাপত্তার অপরিহার্য অংশ হিসেবে ধরা হয়, ঠিক সেই ভাবেই AED এবং CPR-প্রশিক্ষিত কর্মীকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কয়েক মিনিটের প্রস্তুতি একটি জীবন বাঁচিয়ে দিতে পারে।” চিকিৎসকদের মতে, হঠাৎ কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে সবচেয়ে বড় অস্ত্র শুধু হাসপাতাল নয়, বরং ঘটনাস্থলে উপস্থিত সচেতন মানুষ। কারণ, অ্যাম্বুল্যান্স পৌঁছনোর আগের কয়েক মিনিটেই লুকিয়ে থাকে জীবনের শেষ সুযোগ।




