নিউজ ডেস্ক: ‘বন্দে মাতরম’-এর ছয়টি স্তবক গাওয়া এবং তা ঘিরে আইনি শাস্তির বিধান নিয়ে দায়ের হওয়া মামলায় মঙ্গলবার গুরুত্বপূর্ণ শুনানি হল সুপ্রিম কোর্টে। কর্নাটকের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী টি এম কৃষ্ণের করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রের বক্তব্য জানতে চেয়েছে শীর্ষ আদালত। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির বেঞ্চে মামলাটি ওঠে। আদালত জানিয়েছে, বিষয়টির বিশেষ করে শাস্তিমূলক দিক খতিয়ে দেখা হতে পারে।
মামলার কেন্দ্রে রয়েছে ‘বন্দে মাতরম’-এর সম্পূর্ণ ছয়টি স্তবক সরকারি, আনুষ্ঠানিক ও নির্দিষ্ট গণ-অনুষ্ঠানে গাওয়ার বিষয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশ এবং ২০২৬ সালে ‘Prevention of Insults to National Honour Act, 1971’-এ আনা সংশোধনী। কৃষ্ণের আবেদনে এই নির্দেশ ও সংশোধনীর সাংবিধানিক বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।
মামলাকারীর যুক্তি, গানের শেষের চারটি স্তবকে দুর্গা, লক্ষ্মী ও সরস্বতীর মতো হিন্দু দেবদেবীর উল্লেখ রয়েছে। তাই সেই অংশগুলি গাওয়ার বাধ্যবাধকতা ব্যক্তির ধর্মীয় স্বাধীনতা ও বিবেকের অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে বলে আবেদনে দাবি করা হয়েছে। এই বিষয়টি সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর সঙ্গেও সম্পর্কিত বলে মামলাকারীর পক্ষ থেকে আদালতে যুক্তি দেওয়া হয়।
তবে মঙ্গলবারের শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট ‘বন্দে মাতরম’-এর জাতীয় গানের মর্যাদা নির্ধারণের প্রশ্নকে নিজেদের বিচার্য বিষয় হিসেবে নেয়নি। আদালতের নজর মূলত আইনটির শাস্তিমূলক প্রয়োগের দিকে। বেঞ্চ ১৯৮৬ সালের ‘বিজোয় ইমানুয়েল’ মামলার নজিরের কথাও উল্লেখ করে। ওই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট বিবেক ও ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে জাতীয় সঙ্গীত না গাওয়া ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সুরক্ষা দিয়েছিল। বর্তমান মামলায় সেই নীতির প্রাসঙ্গিকতা কতটা, সেটিও খতিয়ে দেখার ইঙ্গিত দিয়েছে আদালত।
মামলাকারীর আইনজীবী প্রবীণ আইনজীবী এস মুরলীধর আদালতে আরও প্রশ্ন তোলেন, সংশোধিত আইনে ‘জাতীয় সঙ্গীত’ বা সংশ্লিষ্ট পরিভাষার স্পষ্ট সংজ্ঞা রয়েছে কি না। তাঁর বক্তব্য, কোনও নির্দেশ বা সরকারি মেমোরেন্ডারের ভিত্তিতে ফৌজদারি দায় তৈরি করার ক্ষেত্রে স্পষ্টতা থাকা প্রয়োজন।
শুনানির সময় কেন্দ্রের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতাও বক্তব্য রাখেন। আদালতে ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখ্যা নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়। শুনানিতে ‘নকশাল’ শব্দের ব্যবহার নিয়েও উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয় এবং মামলাকারীর আইনজীবী সেই মন্তব্যের বিরোধিতা করেন।
এদিকে, ২০২৬ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে ‘বন্দে মাতরম’-কেও জাতীয় সম্মানের অবমাননা প্রতিরোধ সংক্রান্ত আইনি কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে। তবে এর অর্থ প্রত্যেক নাগরিককে সব ছয়টি স্তবক গাইতেই হবে এমন সরাসরি বাধ্যবাধকতা আইনটির প্রয়োগ কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে, সেটিই বর্তমান মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলির একটি।
সুপ্রিম কোর্ট আপাতত কেন্দ্রের বক্তব্য জানতে চেয়েছে। আগামী শুনানিতে কেন্দ্রের জবাবের পর মামলাটির পরবর্তী গতিপথ আরও স্পষ্ট হতে পারে। ফলে ‘বন্দে মাতরম’-এর সম্পূর্ণ সংস্করণ, ব্যক্তির বিবেক ও ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ফৌজদারি শাস্তির বিধান এই তিনটি বিষয়ই এখন সুপ্রিম কোর্টের বিবেচনার কেন্দ্রে।
