একটি কণ্ঠস্বর কি একটি জাতির স্মৃতি হয়ে উঠতে পারে? বাঙালির ক্ষেত্রে উত্তরটা নিঃসন্দেহে ‘হ্যাঁ’। কারণ, শরতের আকাশে কাশফুল দুলতে শুরু করলেই, ভোরের হালকা অন্ধকারে রেডিয়োর সুইচ ঘোরানোর অভ্যাস আজও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। আর সেই মুহূর্তেই যেন ভেসে আসে— "আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জীর..." কিংবা চণ্ডীপাঠের সেই গম্ভীর উচ্চারণ। কণ্ঠটি একটাই— বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। আজ তাঁর জন্মদিন। কিন্তু বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রকে মনে করার জন্য কোনও বিশেষ দিনের প্রয়োজন হয় না। তিনি এমন এক শিল্পী, যাঁকে বাঙালি ক্যালেন্ডারে নয়, ঋতুচক্রে মনে রাখে। মহালয়ার ভোর এলেই তিনি ফিরে আসেন। প্রতি বছর। প্রতি প্রজন্মে।
একটি কণ্ঠের জন্ম, একটি যুগের শুরু
১৯০৫ সালের ৪ আগস্ট উত্তর কলকাতার এক সংস্কৃতিমনস্ক পরিবারে জন্ম বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের। ছোটবেলা থেকেই বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃত ভাষা, পুরাণ এবং আবৃত্তির প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। পড়াশোনার পাশাপাশি নাট্যচর্চা ও বাচিক শিল্পের প্রতিও আকর্ষণ তৈরি হয়। কেউ ভাবতেও পারেননি, একদিন এই মানুষটির কণ্ঠই বাঙালির সবচেয়ে বড় ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠবে।
রেডিয়োর সোনালি যুগের নায়ক
ভারতে রেডিয়ো যখন বিনোদনের প্রধান মাধ্যম, তখনই আকাশবাণীর সঙ্গে যুক্ত হন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। তিনি শুধু ঘোষক ছিলেন না। ছিলেন নাট্যকার, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, নির্দেশক এবং অসামান্য বাচিকশিল্পী। আকাশবাণীতে তাঁর কণ্ঠ ছিল এক অনন্য উপস্থিতি। উচ্চারণের স্বচ্ছতা, সংস্কৃত ভাষায় দখল এবং নাটকীয় আবেগ— এই তিনের মিশেলে তিনি এক নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছিলেন। আজকের দিনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের কণ্ঠ নকল করতে পারে। কিন্তু বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠের আবেগ এখনও প্রযুক্তির নাগালের বাইরে।
মহিষাসুরমর্দিনী— শুধু অনুষ্ঠান নয়, এক সাংস্কৃতিক মহাকাব্য
১৯৩১ সালে আকাশবাণীতে শুরু হয় 'মহিষাসুরমর্দিনী'। বাণীকুমারের লেখা, পঙ্কজ কুমার মল্লিকের সুর এবং বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ— এই ত্রয়ীর হাত ধরেই জন্ম নেয় বাংলা সংস্কৃতির সম্ভবত সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী রেডিয়ো অনুষ্ঠান। এটি কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছিল না এটি ছিল শব্দ, সঙ্গীত, আবৃত্তি, নাটক, পুরাণ এবং বাঙালির আবেগের এক অপূর্ব সম্মিলন। মহালয়ার ভোর মানেই রেডিয়োর সামনে বসে থাকা— এই অভ্যাস তৈরি করার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠের।
যে ভুল বাঙালি আজও ভুলতে পারেনি
১৯৭৬ সাল। আকাশবাণী সিদ্ধান্ত নেয়, 'মহিষাসুরমর্দিনী'কে আধুনিক রূপ দেওয়া হবে। নতুন অনুষ্ঠানে কণ্ঠ দেন মহানায়ক উত্তম কুমার। নাম রাখা হয় 'দেবীং দুর্গতিহারিণীম'। কিন্তু ফল হয় উল্টো। ভোর থেকেই ক্ষুব্ধ শ্রোতাদের ফোন, চিঠি, প্রতিবাদে কার্যত ভেঙে পড়ে আকাশবাণী। বাঙালি স্পষ্ট জানিয়ে দেয়— মহালয়া মানেই বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। তাঁর কণ্ঠের কোনও বিকল্প নেই। অবশেষে পুরনো অনুষ্ঠানই ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হয় আকাশবাণী। ভারতীয় সম্প্রচার ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল, যেখানে শ্রোতাদের দাবিতে একটি অনুষ্ঠান কয়েক দিনের মধ্যেই ফিরিয়ে আনতে হয়েছে।
কেন তাঁর কণ্ঠ এত আলাদা?
বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র শুধু চণ্ডীপাঠ করতেন না। তিনি শব্দকে অভিনয় করতেন। তাঁর উচ্চারণে সংস্কৃত মন্ত্রও সাধারণ মানুষের কাছে বোধগম্য হয়ে উঠত। শব্দের গতি, বিরতি, আবেগ এবং গভীরতা— সবকিছুর উপর তাঁর ছিল অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ। আজও বাচিকশিল্পের ছাত্রছাত্রীরা তাঁর রেকর্ডিং শুনে উচ্চারণ শেখেন।
শুধু মহালয়া নয়
অনেকেই মনে করেন, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র মানেই মহালয়া। আসলে তাঁর কাজের বিস্তার ছিল অনেক বড়। তিনি অসংখ্য রেডিয়ো নাটক পরিচালনা করেছেন, অভিনয় করেছেন, চিত্রনাট্য লিখেছেন এবং বাংলা বেতার নাটকের ভাষা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন। বাংলা বাচিক শিল্পকে পেশাদার মর্যাদা দেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।
একটি কণ্ঠ, যা ধর্মের গণ্ডি ছাড়িয়েছে
বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ শুধুই ধর্মবিশ্বাসের বিষয় নয়। অনেক বাঙালি আছেন, যাঁরা নিয়মিত পূজাপাঠ করেন না। তবুও মহালয়ার সকালে তাঁর কণ্ঠ না শুনলে দুর্গাপুজোর আবহই তৈরি হয় না। এটাই তাঁর শিল্পের সাফল্য। তিনি ধর্মকে ছাপিয়ে সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছেন।
ডিজিটাল যুগেও কেন প্রাসঙ্গিক?
রেডিয়ো এখন আর একমাত্র মাধ্যম নয়। স্মার্টফোন, ইউটিউব, মিউজিক অ্যাপ, পডকাস্ট— সবই এসেছে। তবু মহালয়ার দিন লক্ষ লক্ষ মানুষ এখনও ইউটিউব বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রথম যে অডিওটি খোঁজেন, সেটি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে 'মহিষাসুরমর্দিনী'। এটাই প্রমাণ করে, প্রযুক্তি বদলালেও আবেগ বদলায় না।
নতুন প্রজন্মের কাছেও কেন প্রাসঙ্গিক?
আজকের প্রজন্ম হয়তো ট্রানজিস্টর রেডিয়ো দেখেনি। কিন্তু শরৎ এলেই সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর কণ্ঠের অংশ ভাইরাল হয়। নতুন করে মানুষ খুঁজে শোনে সেই চণ্ডীপাঠ। কারণ, তাঁর কণ্ঠে এক অদ্ভুত সময়াতীত শক্তি রয়েছে। যে শক্তি শতাব্দী পেরিয়েও শ্রোতার মনকে একইভাবে স্পর্শ করে।
কলকাতার সঙ্গে তাঁর অমোঘ সম্পর্ক
উত্তর কলকাতার অলিগলি, আকাশবাণী ভবন, বেতার নাটকের স্টুডিয়ো— এই শহরের সাংস্কৃতিক মানচিত্রে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র এক স্থায়ী উপস্থিতি। তাঁর বসতবাড়ি আজও ইতিহাসের সাক্ষী। কিন্তু সাংস্কৃতিক মহলের একাংশের মতে, তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে আরও বড় উদ্যোগ নেওয়া উচিত। কারণ, তিনি শুধু একজন শিল্পী নন— তিনি বাংলা সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান।
কিংবদন্তি বললে কম বলা হয়
বাঙালির কাছে দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এক আবেগের নাম। আর সেই আবেগের দরজা খুলে দেন যে মানুষটি, তিনি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। তাঁর কণ্ঠে চণ্ডীপাঠ শুনে বড় হয়েছে কয়েকটি প্রজন্ম। রেডিয়ো থেকে স্মার্টফোন— মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু মহালয়ার ভোরে বাঙালির কান এখনও সেই এক কণ্ঠস্বরই খোঁজে। হয়তো এ কারণেই বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রকে কেবল কিংবদন্তি বললে কম বলা হয়। তিনি আসলে বাঙালির ঋতুস্মৃতি। শরতের প্রথম হাওয়া। মহালয়ার প্রথম আলো। আর এমন এক কণ্ঠ, যাকে সময় কখনও বুড়ো করতে পারেনি।