ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে বাংলাদেশের উপকূলকে রক্ষা করা বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন এখন নিজেই ভয়াবহ ভাঙনের মুখে পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং তীব্র জোয়ার-ভাটার কারণে বনের নদী ও বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী অঞ্চলগুলো অনবরত বিলীন হচ্ছে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন, নদী দূষণ ও নির্বিচারে সম্পদ আহরণের মতো মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক নানা আগ্রাসনে ধুঁকছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। অন্যদিকে গাছকাটা, বন্যপ্রাণী শিকার আর বিষ দিয়ে মাছ নিধন থেকে শুরু করে প্লাস্টিকের দূষণসহ মানুষের তৈরি নানা পদক্ষেপে হুমকির মুখে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন।
সুন্দরবন মায়ের মতো প্রতিটি বড় বড় ঘূর্ণিঝড়ের হাত থেকে উপকুলবাসীকে রক্ষা করছে। উপকূলের কোটি-কোটি মানুষকে নিরাপদ রাখতে ও তাদের জীবিকা নির্বাহে সুন্দরবন ব্যাপক ভূমিকা রাখে। অথচ বছরের পর বছর সেই সুন্দরবনই ভালো নেই। ম্যানগ্রোভ এই বন জীববৈচিত্র্য ধ্বংসকারী চোরা শিকারি, পানিবায়ুর পরিবর্তনে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি, পরিবেশ দূষণ ও কাঠ পাচারকারীদের কারণে এখন অস্তিত্ব সংকটে।
উপকূলের রক্ষাকবচ সুন্দরবন বঙ্গোপসাগর ও নদীর অব্যাহত ভাঙনে বর্তমানে নিজেই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, যার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে তীব্র নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় রেমালের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাত এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি। পরিবেশবিদদের মতে, বিশেষ করে পূর্ব সুন্দরবনের অন্তত ১২টি এলাকা তীব্র ভাঙনের শিকার হয়ে দ্রুত ছোট হয়ে আসছে।
ম্যানগ্রোভ বন রক্ষায় প্রতি বছর ২৬ জুলাই ‘আন্তর্জাতিক ম্যানগ্রোভ দিবস’ পালিত হয়ে আসছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। সচেতনতা বাড়াতে বাংলাদেশেও পালন করা হয় এ দিবস। সে তুলনায় দিনের পর দিন বন বিনষ্টের কারণ হিসেবে চিহ্নিত আগ্রাসনগুলো বন্ধের তোড়জোড় খুব কমই বলে তুলে ধরছেন পরিবেশ কর্মী ও বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতেও সুন্দরবনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এটি বাংলাদেশের বনজ সম্পদের একক বৃহত্তম উৎস। এ বন কাঠের ওপর নির্ভরশীল শিল্পে কাঁচামাল জোগান দেয়। এছাড়া কাঠ, জ্বালানি ও বনজ সম্পদের পাশাপাশি সুন্দরবন থেকে ঘর ছাওয়ার পাতা, মধু, মৌচাকের মোম, মাছ, কাঁকড়া ও শামুক-ঝিনুক ব্যাপকভাবে আহরণ করা হয়। বৃক্ষপূর্ণ সুন্দরবনের ভূমি একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় আবাসস্থল, পুষ্টি উৎপাদক, পানি বিশুদ্ধকারক, পলি সঞ্চয়কারী, ঝড় প্রতিরোধক, উপকূল স্থিতিকারী, শক্তি সম্পদের আধার এবং পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে।
সূত্রমতে, খালের একপাশে সুন্দরবন, অন্যপাশে রিসোর্ট। বনের এত কাছে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়াই নির্মাণ করা হয়েছে অন্তত ৩০টি কটেজ-রিসোর্ট। খুলনার দাকোপের কৈলাশগঞ্জ, ঢাংমারী ওবানিশান্তা, বাগেরহাটের মোংলা এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগরে সুন্দরবনের পাশে গড়ে উঠেছে এগুলো। সুন্দরবনের কোলঘেঁষে বনের গাছ কেটে, খাল ভরাট করে গড়ে তোলা এসব কটেজ-রিসোর্টের বেশিরভাগ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ (এসি)। বিদ্যুৎ না থাকলে চালানো হয় বিকট শব্দের জেনারেটর। রাতে আলোকোজ্জ্বল এসব রিসোর্টে বাজানো হয় উচ্চশব্দে গান।
এছাড়া বঙ্গোপসাগর থেকে মোংলা বন্দর পর্যন্ত সুন্দরবনের মধ্যে ১৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ পশুর নদ দিয়ে জাহাজ চলাচল করে। মোংলা হয়ে সুন্দরবনের মধ্যে কালিঞ্চি, রায়মঙ্গল, কাচিকাটা, আড়পাঙ্গাশিয়া, বজবজা, আড়ুয়া শিবসা, শিবসা ও পশুর নদ দিয়ে ভারতে আসা-যাওয়া করে জাহাজ। সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে ছোটবড় জাহাজ চলাচলের পাশাপাশি জাহাজ ডুবির ঘটনাও ঘটেছে বিভিন্ন সময়। এতে বনের প্রতিবেশ ক্ষতির মুখে পড়ার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে বঙ্গোপসাগর ও নদীর অব্যাহত ভাঙনে পূর্ব সুন্দরবনের অন্তত ১২টি এলাকা দ্রুত বিলীন হলেও গত সাত দশকে কত বনভূমি হারিয়েছে, তার কোনো নির্ভরযোগ্য সরকারি হিসাব বা সমন্বিত তথ্যভান্ডার নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই তথ্য শূন্যতা কার্যকর পরিকল্পনার বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এতে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে উপকূলীয় নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক বর্ম।
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১২টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নদী ও সাগরে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে কটকা ও কচিখালী, সুপতি ফরেস্ট স্টেশন, তেরাবেকা ফরেস্ট অফিস, মেহের আলীর চরের সাইক্লোন শেল্টার কাম ফরেস্ট অফিস এবং বগী ফরেস্ট স্টেশন। পাশাপাশি জোংড়া, করমজল, দুবলা, কোকিলমনি, শাপলা, চরখালী, ডুমরিয়া, ঢাংমারি ও চান্দেশ্বর পয়েন্টেও ভাঙনের চাপ বাড়ছে। তবে এসব এলাকায় কত বনভূমি বিলীন হয়েছে বা নতুন ভূমি বনাঞ্চলে যুক্ত হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো সমন্বিত সরকারি তথ্যভান্ডার নেই।
জলবায়ু ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনের কাছেই গড়ে ওঠা শিল্পকারখানা, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও রিসোর্টগুলো হয়ে উঠেছে বড় ক্ষতির কারণ। নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটন, প্লাস্টিকের দূষণ, বনের মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচল ও পণ্যবাহী জাহাজডুবির ভয়াবহ প্রভাবও পড়ছে। থেমে নেই বিষ দিয়ে মাছ ধরা, মাত্রাতিরিক্ত সম্পদ আহরণ, গাছ কাটা, আগুন দেওয়া ও বন্যপ্রাণী শিকার। সবকিছুর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বনের নদী, মাটি, গাছপালা ও প্রাণীর ওপর।
পরিবেশবাদী সংগঠন প্রদীপনের নির্বাহী পরিচালক ফেরদৌস-উর-রহমান বলেন, সুন্দরবনের আয়তন কমে গেলে উপকূলীয় নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। এটি শুধু বন নয়, একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল মোল্লা বলেন, সিডর, আইলা ও রেমালে সুন্দরবনের গাছ ভেঙেছে, বন্য প্রাণী মরেছে ঠিকই কিন্তু বঙ্গোপসাগর থেকে আসা জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা ঠেকিয়ে দিয়ে আমাদের উপকূলীয় বাসিন্দাদের রক্ষা করেছে। কিন্তু বন কমতে থাকলে ভবিষ্যতে সেই সুরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়বে।