দিব্যেন্দু ঘোষ: সভ্যতার অগ্রগতির পথে মানুষ তার স্মৃতিকে ধরে রাখতে চেয়েছে নানা মাধ্যমে। কখনও পাথরের গায়ে খোদাই করে, কখনও বা তুলির টানে ক্যানভাসে। কিন্তু সময়ের গতিকে নিখুঁত ও অপরিবর্তিত রূপে ধরে রাখার সবচেয়ে জাদুকরী মাধ্যম আলোকচিত্র বা ফটোগ্রাফি। ১৯ আগস্ট ‘বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস’ শুধুই একটা নির্দিষ্ট তারিখ নয়, সময়কে থমকে দেওয়ার এবং দৃশ্যমান ইতিহাসকে উদযাপনের মহোৎসব। এই উদযাপনের প্রেক্ষাপটে ভারতীয় চিত্রসাংবাদিকতার আকাশে ধ্রুবতারার নাম রঘু রাই। যাঁর ক্যামেরা কেবল ছবি তোলেনি, বরং ভারতীয় জনজীবন, ইতিহাস এবং আত্মাকে সততার সঙ্গে ফ্রেমে বন্দি করেছে।
ক্ষণিকের অমরত্ব
প্রতি বছর ১৯ আগস্ট বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস। ১৮৩৯ সালের এই দিনে ফরাসি বিজ্ঞানী লুই ডাগুয়ের এবং জোসেফ নিসেফোর নিপসের উদ্ভাবিত ‘ডগেরোটাইপ’ ফটোগ্রাফি প্রক্রিয়ার পেটেন্ট ফরাসি সরকার উন্মুক্ত করে দেয়। এটাই ছিল মানব ইতিহাসে প্রথম আলোর সাহায্যে স্থায়ী ছবি তোলার সফল প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ। ফটোগ্রাফি মানে শুধু যান্ত্রিকভাবে লেন্সের বোতাম টেপা নয়; মানুষের অন্তর্লীন দৃষ্টি, আবেগের বহিঃপ্রকাশ এবং পারিপার্শ্বিক বাস্তবতার নান্দনিক দলিল। একটা স্থিরচিত্র হাজার শব্দের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হতে পারে, অতীতকে বর্তমানের মুখোমুখি দাঁড় করায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বর্তমানকে সংরক্ষণ করে। বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমাদের চারপাশে ঘটে চলা সাধারণ মুহূর্তগুলোর মধ্যেও অসাধারণ গল্প লুকিয়ে থাকে, যা একজন প্রকৃত শিল্পীর চোখেই ধরা পড়ে।
ভারতীয় ফটোগ্রাফির মহীরুহ
এই আলোকচিত্রের বিশাল জগতে ভারতের নাম উজ্জ্বলতম নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করেছে যাঁর কাজের মাধ্যমে, তিনি হলেন প্রবাদপ্রতিম আলোকচিত্রী রঘু রাই। ১৯৪২ সালে অবিভক্ত ভারতের ঝাংয়ে জন্ম নেওয়া রঘু রাই তাঁর দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময়ের কেরিয়ারে ভারতের মনন, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও সংকটের জীবন্ত দলিল তৈরি করে গেছেন। রঘু রাইয়ের কর্মজীবন মোটেও সহজ ছিল না। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে ১৯৬০-এর দশকে তিনি যখন পুরোপুরি ফটোগ্রাফির দিকে ঝুঁকলেন, তখন থেকেই শুরু হয় এক নতুন ইতিহাস। ১৯৬৬ সালে ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকার মাধ্যমে তাঁর ফটোসাংবাদিকতার পেশাদার যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে ভারতের অন্যতম প্রধান ম্যাগাজিন ‘ইন্ডিয়া টুডে’-র সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি দেশজুড়ে সাংবাদিকতার মানদণ্ড বদলে দেন।
ম্যাগনাম ফটোস
রঘু রাইয়ের জীবনের অন্যতম বড় মাইলফলক ছিল ১৯৭৭ সালে বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক ও মর্যাদাপূর্ণ ফটো এজেন্সি ‘ম্যাগনাম ফটোস’-এ তাঁর অন্তর্ভুক্তি। বিশ্বখ্যাত ফরাসি আলোকচিত্রী অঁরি কার্তিয়ে-ব্রেসেঁর ব্যক্তিগত মনন ও মনোনয়নে তিনি এই সংস্থার সদস্য হন। আন্তর্জাতিক পরিসরে ভারতের নিজস্ব মুখাবয়ব ও আবেগ ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে এটা ছিল এক ঐতিহাসিক স্বীকৃতি। ভারত সরকার তাঁকে ১৯৭২ সালে দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অসামরিক সম্মান ‘পদ্মশ্রী’-তে ভূষিত করে।
সংবেদনশীল লেন্সে মানবতা
রঘু রাইয়ের ক্যামেরা কেবল ঘটনার সাক্ষী ছিল না, তা হয়ে উঠেছিল সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ ও প্রতিবাদের ভাষা। তাঁর কাজের পরিসর ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত ও গভীর। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী শিবির ও যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়াবহতা এবং মানুষের টিকে থাকার লড়াইকে তিনি অত্যন্ত মমতায় ও সাহসিকতার সঙ্গে ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন। ১৯৮৪ সালে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনা ভোপাল গ্যাস বিপর্যয়ের পরের দিনগুলোতে তিনি সেখানে ছুটে যান। তাঁর লেন্সের মাধ্যমে উঠে আসা সেই হৃদয়বিদারক ছবিগুলো মানব সভ্যতার চিরকালীন সতর্কবার্তা এবং বিশ্ববাসীর বিবেককে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো দলিল। দলাই লামার শান্ত ও দীপ্তিময় মুখাবয়ব থেকে শুরু করে ভারতের বিভিন্ন প্রধানমন্ত্রী ও রাজনৈতিক পালাবদল— তাঁর লেন্সের ফ্রেমে সবাই এক অনন্য মানবিক সত্তায় ধরা দিয়েছেন। তিনি বলতেন, ‘আমি আমার ক্যামেরার মাধ্যমেই আমার ঈশ্বরের সন্ধান পাই’।
চলতি বছরের এপ্রিলে রঘু রাই আমাদের ছেড়ে চিরতরে চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি ও দর্শন ফুরিয়ে যাওয়ার নয়। বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবসের মূল তাৎপর্য যেখানে আলোর সদ্ব্যবহার এবং সত্যকে উন্মোচন করার মধ্যে নিহিত, রঘু রাই আজীবন সেই ব্রতকেই লালন করে গেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে ভাল ছবির জন্য দামি ক্যামেরার চেয়েও বেশি প্রয়োজন সংবেদনশীল হৃদয় এবং দেখার মতো এক জোড়া চোখ। আজকের ডিজিটাল যুগে যখন ফিল্টার আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভিড়ে আসল সত্য হারিয়ে যেতে বসেছে, তখন রঘু রাইয়ের জীবন ও কাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ফটোগ্রাফি আসলে আলো ও চোখের এক অদ্ভুত জাদুকরী সংলাপ, যা চিরকাল মানুষের মনকে নাড়া দিতে থাকবে।