তারাতলার নির্মীয়মাণ বহুতল ধসে কয়েক মুহূর্তে ভেঙে পড়েছিল শুধু একটি কংক্রিটের কাঠামো নয়, কলকাতা পুরসভার নজরদারি ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাও। দুর্ঘটনার পর অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনায় সামনে এসেছে এক উদ্বেগজনক তথ্য, আড়াই বছর আগে বিপুল আড়ম্বরে চালু হওয়া ডিজিটাল ডায়েরি (Digital Log Book) ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট নির্মাণে কার্যত কাগজেই সীমাবদ্ধ ছিল। নিয়ম ছিল, প্রযুক্তি ছিল, মোবাইল অ্যাপও ছিল। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সেই নিয়মের প্রয়োগই হয়নি।
এই অভিজ্ঞতার পরই নড়েচড়ে বসেছে কলকাতা পুরসভা। বেআইনি নির্মাণ রুখতে এবং নির্মাণস্থলে ইঞ্জিনিয়ারদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ডিজিটাল লগ বুক ব্যবস্থা ফের কঠোরভাবে কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছেন পুর প্রশাসক স্মিতা পাণ্ডে। পুরসভার শীর্ষ কর্তাদের স্পষ্ট বার্তা, কাগজে-কলমে নয়, এবার মাঠে নেমেই প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
পুরসভা সূত্রের খবর, এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে রয়েছে গত কয়েক বছরের একের পর এক নির্মাণ-বিপর্যয়ের অভিজ্ঞতা। ২০২৪ সালের মার্চে গার্ডেনরিচে একটি নির্মীয়মাণ বহুতল ভেঙে পড়ে ১৩ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। সেই ঘটনায় শুধু নির্মাতাদের ভূমিকা নয়, পুরসভার ইঞ্জিনিয়ারদের নিয়মিত পরিদর্শন ও নজরদারি নিয়েও তীব্র প্রশ্ন উঠেছিল। তদন্তের পর একাধিক ইঞ্জিনিয়ারকে সাসপেন্ডও করা হয়। সেই ঘটনার পরই তৎকালীন পুর কমিশনার ধবল জৈনের উদ্যোগে চালু হয় ডিজিটাল লগ বুক ব্যবস্থা, যার লক্ষ্য ছিল নির্মাণের প্রতিটি ধাপকে প্রযুক্তির মাধ্যমে নথিবদ্ধ করা এবং নজরদারিকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করে তোলা।
নিয়ম অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার (SAE)-কে নির্দিষ্ট সময় অন্তর নির্মাণস্থলে উপস্থিত হয়ে সরেজমিনে পরিদর্শন করতে হয়। শুধু খাতায় সই করলেই দায়িত্ব শেষ নয়। ঘটনাস্থল থেকেই মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে নির্মাণের ছবি তুলতে হবে, সেই ছবি আপলোড করতে হবে এবং অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী কাজ হচ্ছে কি না, তার বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ লিখতে হবে। কোথাও নকশার বাইরে নির্মাণ হলে তা নথিবদ্ধ করে সঙ্গে সঙ্গে নোটিস জারি করারও নির্দেশ রয়েছে। প্রয়োজনে ডি-স্কেচ সংযুক্ত করে কোথায় কী ধরনের অনিয়ম হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট বিবরণও দিতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়লে সঙ্গে সঙ্গেই 'স্টপ ওয়ার্ক' নোটিস জারি করা বাধ্যতামূলক। সেই নির্দেশ অমান্য করে নির্মাণ চলতে থাকলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ারও স্পষ্ট বিধান রয়েছে। ডিজিটাল লগ বুকের মাধ্যমে আপলোড হওয়া প্রতিটি ছবি, সময়, জিপিএস লোকেশন এবং পরিদর্শনের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংরক্ষিত থাকে। ফলে কোনও ইঞ্জিনিয়ার পরে দাবি করতে পারবেন না যে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন বা যাননি। একই সঙ্গে বরোর এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার, ডিরেক্টর জেনারেল, পুর কমিশনার-সহ শীর্ষ কর্তারা যে কোনও সময় অনলাইনে সেই তথ্য খতিয়ে দেখতে পারেন।
কিন্তু তারাতলার ঘটনায় অভ্যন্তরীণ তদন্তে উঠে এসেছে, এই প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়েছে। নিয়মিত পরিদর্শনের যে ডিজিটাল রেকর্ড থাকার কথা ছিল, তার অনেকটাই অসম্পূর্ণ বা অনুপস্থিত। কোথাও সময়মতো ছবি আপলোড হয়নি, কোথাও আবার সম্ভাব্য অনিয়ম যথাযথভাবে নথিভুক্ত করা হয়নি। পুর প্রশাসনের একাংশের মতে, নিয়মমাফিক ডিজিটাল লগ বুক ব্যবহার করা হলে নির্মাণে অসঙ্গতি অনেক আগেই নজরে আসতে পারত এবং হয়তো বিপর্যয়ও এড়ানো সম্ভব হতো।
এই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার আর কোনও শৈথিল্য রাখতে নারাজ পুরসভা। প্রশাসনের অন্দরের বক্তব্য, বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শুধু আইন নয়, প্রযুক্তিকেও কার্যকর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। মাঠপর্যায়ের প্রতিটি পরিদর্শন এখন থেকে ডিজিটাল রেকর্ডে নথিবদ্ধ করা হবে। কোথাও গাফিলতি ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট ইঞ্জিনিয়ারের জবাবদিহিও নিশ্চিত করা হবে।
কলকাতা জুড়ে দ্রুত বদলে যাচ্ছে শহরের স্কাইলাইন। পুরনো বাড়ি ভেঙে উঠছে বহুতল। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যদি নজরদারির ব্যবস্থা শক্তিশালী না হয়, তবে তারাতলা বা গার্ডেনরিচের মতো দুর্ঘটনা ফের ফিরে আসতে পারে, এমন আশঙ্কাই করছেন নগর পরিকল্পনাবিদদের একাংশ। তাই পুরসভার আশা, কাগজে নয়, বাস্তবে যদি ডিজিটাল নজরদারি কার্যকর হয়, তবে বেআইনি নির্মাণে লাগাম টানা যেমন সহজ হবে, তেমনই ভবিষ্যতে বহু প্রাণহানিও এড়ানো সম্ভব হবে।