‘আপনার ধারণাটা ভালো, কিন্তু এতে টাকা লগ্নি করার মতো ভবিষ্যৎ আমরা দেখছি না।’
স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের কাছে এই একটি বাক্যই অনেক সময় স্বপ্নভঙ্গের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বারবার 'না' শুনতে শুনতে অনেকেই মাঝপথে থেমে যান। কিন্তু ভিক্টর রিপারবেল্লি থামেননি। একজন নয়, দু'জন নয়— প্রায় ১০০ জন বিনিয়োগকারী তাঁর স্টার্টআপে অর্থ ঢালতে অস্বীকার করেছিলেন। কেউ বলেছিলেন প্রযুক্তিটি অত্যন্ত অপরিণত, কেউ বলেছিলেন বাজার এখনও প্রস্তুত নয়, আবার কারও মতে মানুষ কোনও দিনই বাস্তব মানুষের বদলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর ডিজিটাল অবতারের সঙ্গে কথা বলতে স্বচ্ছন্দ হবে না। সময়ই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় জবাব দিয়েছে।
আজ রিপারবেল্লির প্রতিষ্ঠিত Synthesia-র বাজারমূল্য ৪ বিলিয়ন ডলার। ইউরোপের অন্যতম সফল AI স্টার্টআপ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে সংস্থাটি। যে প্রযুক্তিকে এক সময় কল্পবিজ্ঞান বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই প্রযুক্তিই এখন বহুজাতিক সংস্থা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং সরকারি দফতরের দৈনন্দিন কাজের অংশ।
যখন AI ছিল কেবল গবেষণাগারের বিষয়
এখন AI মানেই ChatGPT, ছবি তৈরি, ভিডিও বানানো কিংবা মুহূর্তে লেখা তৈরি। কিন্তু ২০১৭ সালে ছবিটা ছিল একেবারেই অন্য রকম। তখন জেনারেটিভ AI সাধারণ মানুষের আলোচনায় আসেনি। OpenAI-এর ChatGPT বাজারে আসতে তখনও পাঁচ বছরেরও বেশি সময় বাকি। AI নিয়ে কাজ চলছিল ঠিকই, কিন্তু অধিকাংশ বিনিয়োগকারী মনে করতেন, এই প্রযুক্তির বাণিজ্যিক ব্যবহার অনেক দূরের বিষয়।
ঠিক সেই সময়েই রিপারবেল্লি একটি সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যেখানে ক্যামেরা, স্টুডিও, অভিনেতা বা দীর্ঘ সম্পাদনা ছাড়াই কেবল একটি লেখা দিলেই AI বাস্তব মানুষের মতো ভিডিও উপস্থাপক তৈরি করবে। আজ শুনতে সাধারণ মনে হলেও, আট-নয় বছর আগে এই ধারণা অনেকের কাছেই অবাস্তব ছিল।
১০০টি প্রত্যাখ্যান, কিন্তু একবারও হাল ছাড়েননি
প্রাথমিক মূলধন সংগ্রহের জন্য রিপারবেল্লি একের পর এক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করেন। কিন্তু ফল একই— প্রত্যাখ্যান। কেউ মনে করেছিলেন প্রযুক্তিটি অতিরিক্ত ব্যয়বহুল। কেউ বলেছিলেন, ভিডিও তৈরির জন্য মানুষ কোনও দিন AI-কে বিশ্বাস করবে না। অনেকেই পরামর্শ দিয়েছিলেন ব্যবসার ধারণা পাল্টে ফেলতে।
কিন্তু রিপারবেল্লির যুক্তি ছিল, পৃথিবীর প্রতিটি সংস্থা প্রতিদিন হাজার হাজার প্রশিক্ষণমূলক ভিডিও, কর্মীদের নির্দেশিকা, গ্রাহক পরিষেবা ও বিপণনের জন্য ভিডিও তৈরি করে। যদি AI সেই কাজ কয়েক মিনিটে এবং অনেক কম খরচে করতে পারে, তবে এই বাজার একদিন বিশাল আকার নেবেই। আজ তাঁর সেই ভবিষ্যদ্বাণীই বাস্তব।
বিনোদন নয়, লক্ষ্য ছিল কর্পোরেট দুনিয়া
অন্যান্য AI সংস্থা যখন সাধারণ ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে এগোচ্ছিল, তখন Synthesia সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ বেছে নেয়।
তারা কর্পোরেট সংস্থাগুলির জন্য AI-নির্ভর ভিডিও তৈরির পরিষেবা শুরু করে। ব্যবহারকারী কেবল স্ক্রিপ্ট লিখে দিলেই ডিজিটাল অবতার সেটিকে বিভিন্ন ভাষায় ভিডিও আকারে উপস্থাপন করতে পারে। নতুন কর্মীদের প্রশিক্ষণ, অভ্যন্তরীণ ঘোষণা, বিপণন, গ্রাহক সহায়তা— সব ক্ষেত্রেই এই প্রযুক্তি দ্রুত জনপ্রিয় হতে শুরু করে। এর ফলে সংস্থার গ্রাহকসংখ্যা দ্রুত বাড়ে এবং আয়ের ধারাও শক্তিশালী হয়।
ChatGPT এল, বদলে গেল AI-এর ভাগ্যও
২০২২ সালের শেষ দিকে ChatGPT আত্মপ্রকাশের পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গোটা বিশ্বে অভূতপূর্ব আগ্রহ তৈরি হয়। AI আর গবেষণাগারের বিষয় রইল না; সাধারণ মানুষের হাতেও পৌঁছে গেল। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগীদের অন্যতম Synthesia। কারণ তখন তাদের প্রযুক্তি তৈরি, গ্রাহক তৈরি এবং বাজার তৈরি— সবই হয়ে গিয়েছে। অন্যরা যখন AI ব্যবসা শুরু করার পরিকল্পনা করছে, তখন রিপারবেল্লির সংস্থা ইতিমধ্যেই সেই বাজারে প্রতিষ্ঠিত।
৪ বিলিয়ন ডলারের সাফল্য
সাম্প্রতিক তহবিল সংগ্রহের পর সংস্থার মূল্যায়ন পৌঁছেছে ৪ বিলিয়ন ডলারে। নতুন বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রাথমিক কর্মী এবং বিনিয়োগকারীদের একাংশ নিজেদের শেয়ারের অংশ বিক্রি করে বড় অঙ্কের আর্থিক লাভও করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক বছরে AI-নির্ভর ভিডিও তৈরির বাজার আরও দ্রুত বাড়বে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংবাদমাধ্যম, ই-কমার্স, সরকারি পরিষেবা থেকে শুরু করে ছোট ব্যবসা— সর্বত্র AI ভিডিওর ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে। সেই বাজারে Synthesia ইতিমধ্যেই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়।
এই গল্প আসলে কিসের?
এটি শুধু একটি স্টার্টআপের আর্থিক সাফল্যের গল্প নয়। এটি দেখায়, যুগান্তকারী ধারণাকে শুরুতে প্রায়ই অবিশ্বাস করা হয়। ইতিহাসে অ্যামাজন, টেসলা, এয়ারবিএনবি কিংবা উবার— প্রত্যেককেই প্রথম দিকে সংশয়ের মুখে পড়তে হয়েছে। Synthesia-র গল্প সেই তালিকায় নতুন সংযোজন।
ভিক্টর রিপারবেল্লির যাত্রা তাই মনে করিয়ে দেয়, প্রত্যাখ্যান কখনও কখনও ব্যর্থতার প্রমাণ নয়; বরং সময়ের থেকে এগিয়ে থাকার মূল্য। যে স্বপ্নে এক সময় ১০০ জন বিনিয়োগকারী আস্থা রাখেননি, আজ সেই স্বপ্নই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন অর্থনীতি গড়ে তোলার অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠেছে।