সারাদিনের ক্লান্তির শেষে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছেন। চোখে ঘুমও নেমে এসেছে। কিন্তু ঠিক সেই সময়ই পায়ে শুরু হল অদ্ভুত এক অস্বস্তি। মনে হচ্ছে, যেন পায়ের ভিতর কিছু একটা নড়ছে। কখনও ঝিঁঝিঁ ধরার অনুভূতি, কখনও টান, কখনও আবার জ্বালাপোড়া। যতক্ষণ পা স্থির, ততক্ষণ অস্বস্তি বাড়ছে। শেষমেশ উঠে হাঁটাহাঁটি করতেই মিলছে খানিকটা স্বস্তি। আবার বিছানায় ফিরলেই একই সমস্যা।
এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই হয়। বেশিরভাগ মানুষই এটিকে ক্লান্তি, বাতের ব্যথা কিংবা রক্ত সঞ্চালনের সমস্যা ভেবে গুরুত্ব দেন না। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, এর নেপথ্যে থাকতে পারে রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম (Restless Legs Syndrome বা RLS)— এমন একটি স্নায়বিক রোগ, যা শুধু পায়ের অস্বস্তিই নয়, ধীরে ধীরে মানুষের ঘুম, মানসিক স্বাস্থ্য, কর্মক্ষমতা এবং জীবনযাত্রার মানকেও বিপর্যস্ত করে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, RLS আসলে মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের একটি জটিল সমস্যা। রোগী বিশ্রামে গেলেই, বিশেষ করে সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যে, পা নাড়ানোর এক অদম্য ইচ্ছা অনুভব করেন। সেই ইচ্ছা দমন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি বা পা নাড়ালে অস্বস্তি কমে, কিন্তু বিশ্রামে ফিরলেই আবার একই সমস্যা শুরু হয়। এই কারণেই বহু রোগী বছরের পর বছর অনিদ্রা, ক্লান্তি এবং মানসিক অবসাদের শিকার হন, অথচ বুঝতেই পারেন না যে তাঁরা একটি নির্দিষ্ট রোগে ভুগছেন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই রোগের নির্দিষ্ট কারণ এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে গবেষণা বলছে, অনেক ক্ষেত্রে এটি বংশগত হতে পারে। আবার শরীরে আয়রনের ঘাটতি থাকলেও এই রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। চিকিৎসকদের মতে, RLS-এর সঙ্গে আয়রনের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মস্তিষ্কে ডোপামিন নামের রাসায়নিকের স্বাভাবিক কাজকর্মে আয়রনের ভূমিকা রয়েছে। ডোপামিনের ভারসাম্য নষ্ট হলেই এই সমস্যার উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
শুধু তাই নয়, দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস, কিডনির অসুখ, পারকিনসন রোগ, হাত-পায়ের স্নায়ুর ক্ষতি (Peripheral Neuropathy), ভিটামিন B12 বা ফোলেটের ঘাটতি, এমনকি গর্ভাবস্থার শেষ তিন মাসেও অনেক মহিলার এই সমস্যা দেখা দেয়। কিছু ওষুধ— বিশেষ করে নির্দিষ্ট ধরনের অ্যান্টিহিস্টামিন, অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ও অ্যান্টিসাইকোটিক— উপসর্গ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। অতিরিক্ত চা-কফি, ধূমপান এবং মদ্যপানের অভ্যাসও পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।
এই রোগের লক্ষণও বেশ স্বতন্ত্র। রোগীরা জানান, পায়ের ভিতরে যেন পিঁপড়ে হাঁটছে, কিছু হামাগুড়ি দিচ্ছে বা টান মেরে ধরে আছে। কারও ক্ষেত্রে জ্বালাপোড়া, কারও ক্ষেত্রে চুলকানির মতো অনুভূতি হয়। দীর্ঘক্ষণ গাড়িতে বসে থাকা, সিনেমা দেখা বা বিমানযাত্রার সময় এই অস্বস্তি আরও বেড়ে যেতে পারে। অনেকের আবার গভীর রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যায়। ফলস্বরূপ দিনের বেলায় ক্লান্তি, কর্মক্ষমতা হ্রাস, বিরক্তি, মনোযোগের অভাব এমনকি বিষণ্নতাও দেখা দিতে পারে।
RLS ধরা পড়ার জন্য কোনও একক পরীক্ষা নেই। রোগীর উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষা এবং রক্ত পরীক্ষার উপরই নির্ভর করেন চিকিৎসকেরা। বিশেষ করে Serum Ferritin, Serum Iron, Vitamin B12, Folate, রক্তে শর্করা, কিডনির কার্যকারিতা এবং প্রয়োজনে থাইরয়েড পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। যদি অন্য কোনও ঘুমের রোগের সন্দেহ থাকে, সেক্ষেত্রে স্লিপ স্টাডি (Polysomnography) করা হতে পারে।
চিকিৎসার প্রথম ধাপ জীবনযাত্রায় পরিবর্তন। নিয়মিত ঘুম, হালকা ব্যায়াম, শোবার আগে স্ট্রেচিং, পায়ে ম্যাসাজ, গরম বা ঠান্ডা সেঁক অনেক ক্ষেত্রেই উপসর্গ কমাতে সাহায্য করে। পাশাপাশি ক্যাফেইন, অ্যালকোহল এবং ধূমপান এড়ানোর পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা। যদি আয়রনের ঘাটতি থাকে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শে আয়রন সাপ্লিমেন্ট বা প্রয়োজনে শিরায় আয়রন দেওয়া হয়। গুরুতর ক্ষেত্রে গ্যাবাপেন্টিন, প্রেগাবালিন-সহ কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ ব্যবহার করা হয়। ডোপামিন অ্যাগোনিস্টও কিছু রোগীর ক্ষেত্রে কার্যকর হলেও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে উপসর্গ উল্টো বেড়ে যেতে পারে বলে এখন চিকিৎসকেরা সতর্কতার সঙ্গেই সেগুলি ব্যবহার করেন।
বিশেষজ্ঞদের কথায়, রাতে পা নাড়ানোর প্রবণতাকে 'অভ্যাস' বা 'সামান্য সমস্যা' ভেবে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। কারণ, সময়মতো রোগটি শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসার মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। আর ভালো ঘুম ফিরলে, ফিরবে শরীর ও মনের স্বাভাবিক ছন্দও।