আলিপুরদুয়ার: বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় একটাই কথা—‘‘কলেজ যাচ্ছি।’’ বই-খাতা সঙ্গে। অভিভাবকেরও নিশ্চিন্ত থাকার কথা। কিন্তু সেই নিশ্চিন্তিতে এ বার ধাক্কা আলিপুরদুয়ার মহিলা মহাবিদ্যালয়ে। হাজিরার খাতা খুলে দেখা গেল, গত এক মাসে অনার্সের একটি ক্লাসেও যাননি এমন ছাত্রী রয়েছেন। কেউ আবার পাঁচ দিনেরও কম ক্লাস করেছেন। অথচ তাঁদের অনেকের বাড়িতেই খবর ছিল, মেয়ে নিয়মিত কলেজ যাচ্ছে।
বিষয়টি সামনে আসতেই ‘কল দ্য পেরেন্টস’ শুরু করল কলেজ। অর্থাৎ, ক্লাসে অনুপস্থিতির খবর এ বার সরাসরি পৌঁছে যাবে অভিভাবকের ফোনে। শুধু ফোন করেই দায়িত্ব শেষ নয়। প্রয়োজন হলে অভিভাবকদের কলেজে ডেকে দেখানো হচ্ছে মেয়ের হাজিরার হিসাব।
আলিপুরদুয়ার মহিলা মহাবিদ্যালয়ে বাংলা, ইংরেজি, এডুকেশন, ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সংস্কৃত এবং দর্শন বিষয়ে পড়ানো হয়। গত ৩ অগস্ট থেকে প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু হয়েছে। কলেজ সূত্রের খবর, ইতিমধ্যে অনার্সের প্রায় ৬৫টি ক্লাস হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় কয়েক জন ছাত্রীর উপস্থিতি অত্যন্ত কম। বিভাগগুলির কাছ থেকে হাজিরার হিসাব নিয়ে সেই তালিকা তৈরি করা হয়।
প্রথম ধাপে এমন ৩০ জন ছাত্রীর অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে, যাঁরা গত এক মাসে পাঁচ দিনও ক্লাস করেননি। কলেজ সূত্রের খবর, অধ্যক্ষ অমিতাভ রায় নিজে ১৫ জন অভিভাবককে ফোন করেছেন। কয়েক জন ইতিমধ্যে কলেজে এসে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথাও বলেছেন।
আর সেখানেই সামনে এসেছে আরও চমকপ্রদ ছবি। কলেজ কর্তৃপক্ষের দাবি, কয়েক জন ছাত্রী বাড়ি থেকে নিয়মিত কলেজ যাওয়ার কথা বলে বেরোলেও কলেজের ক্লাসে তাঁদের দেখা মিলছে না। ফলে মেয়েরা কলেজেই যাচ্ছে—এই ধারণা ছিল পরিবারের। কলেজ থেকে ফোন যাওয়ার পরেই সেই ধারণা ভেঙেছে।
অধ্যক্ষ অমিতাভ রায় বলেন, ‘‘গত এক মাস ধরে প্রতিটি বিভাগের কাছ থেকে ছাত্রীদের উপস্থিতির তথ্য নেওয়া হয়েছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। প্রায় ৬৫টি অনার্সের ক্লাস হয়ে গিয়েছে। নিয়মিত ক্লাস না করলে পড়াশোনার ফল ভাল হবে না, পরীক্ষার নম্বরেও তার প্রভাব পড়বে। তাই প্রথম ধাপে অভিভাবকদের বিষয়টি জানিয়ে সতর্ক করা হচ্ছে।’’
কলেজ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, উদ্দেশ্য শাস্তি দেওয়া নয়, ছাত্রীদের নিয়মিত ক্লাসে ফেরানো। তবে সতর্ক করার পরেও কারও উপস্থিতির হার না বাড়লে নিয়ম মেনে পরবর্তী পদক্ষেপ করা হতে পারে।
কলেজের এক ছাত্রীর অভিভাবক মাম্পি সরকার বলেন, ‘‘কলেজের এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। আমাকে এখনও কলেজ থেকে ফোন করেনি। আমার মেয়ে প্রতিদিন কলেজে যায়। তবে চারপাশে নানা ধরনের ঘটনা শুনতে পাই। অনেক ছাত্রী হয়তো বাড়িতে কলেজে যাওয়ার কথা বলে বেরিয়ে কলেজে যাচ্ছে না। সেই জায়গা থেকে এই উদ্যোগ খুবই ভাল। অভিভাবকদেরও উচিত সন্তান সত্যিই কলেজে যাচ্ছে কি না, সে বিষয়ে খোঁজ রাখা।’’
শিক্ষামহলের একাংশের মতে, কলেজে ভর্তি হওয়ার পর অনেক পড়ুয়ার মধ্যেই স্কুলের মতো নিয়মিত ক্লাস করার প্রবণতা কমে যায়। প্রথম বর্ষে বিষয়টি আরও প্রকট হতে পারে। তাই কলেজ ও পরিবারের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হলে পড়ুয়াদের উপর নজরদারির পাশাপাশি তাঁদের দায়িত্ববোধও বাড়তে পারে।
কলেজ সূত্রে জানা গিয়েছে, ‘কল দ্য পেরেন্টস’ কোনও সাময়িক কর্মসূচি নয়। সারা বছরই ছাত্রীদের হাজিরার উপর নজর রাখা হবে। উপস্থিতি কমলেই অভিভাবকদের জানানো হবে। ফলে এ বার বাড়ি থেকে ‘কলেজ যাচ্ছি’ বলেই নিশ্চিন্তে বেরিয়ে পড়ার দিন শেষ। কলেজের হাজিরার খাতাই বলে দেবে—মেয়ে সত্যিই ক্লাসে বসেছিল, না কি কলেজ যাওয়ার নাম করে অন্য কোথাও ছিল।