মালদা, নিউজ ডেস্ক: তিন দিনের দুর্ভোগের শেষে স্বস্তির আশার আলো। নিউ ফরাক্কার কাছে রেললাইনের নীচে ধস নামার পরে যে পথে উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের রেল যোগাযোগ কার্যত থমকে গিয়েছিল, সেই লাইন মেরামতির কাজ শেষ করে এ বার নিরাপত্তার শেষ পরীক্ষায় রেল। শনিবার ইনস্পেকশন কার চালিয়ে শুরু হয়েছে ট্রায়াল রান। ধীর গতিতে মালগাড়িও চালিয়ে দেখে নেওয়া হচ্ছে লাইনের পরিস্থিতি। ইঞ্জিনিয়ারদের রিপোর্টে সবুজ সঙ্কেত মিললে শনিবার রাত থেকেই ধাপে ধাপে উত্তরবঙ্গ-দক্ষিণবঙ্গ ট্রেন চলাচল শুরু হতে পারে বলে রেল সূত্রে খবর।
তবে এখনই পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে চাইছে না রেল। কারণ, গত দু’দিনে মেরামতির মাঝেই একাধিক বার মাটি বসে যাওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছিল। ফলে মেরামতি শেষ হওয়ার পরও যাত্রীবাহী ট্রেন চালানোর আগে লাইন, মাটি এবং ওভারহেড বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার নিরাপত্তা খুঁটিয়ে পরীক্ষা করা হচ্ছে। প্রথমে পরীক্ষামূলক ভাবে ট্রেন চালানো হবে। তার পরে ইঞ্জিনিয়ারদের রিপোর্টের ভিত্তিতেই যাত্রীবাহী ট্রেন চালানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
নিউ ফরাক্কা ও তিলডাঙার মধ্যবর্তী অংশে প্রবল বৃষ্টির জেরে রেললাইনের নীচের মাটি বসে যাওয়াতেই এই বিপত্তির সূত্রপাত। রেলের বক্তব্য, আপ ও ডাউন লাইনের মাঝের বাঁধ দিয়ে জল ঢুকে পড়েছিল। তার পাশে থাকা জলাশয়ের জলও পরিস্থিতি আরও জটিল করে। কাদামাটির জমি ক্রমশ নরম হয়ে গিয়ে আপ লাইনের নীচের মাটি সরে যায়। প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত করা হলেও ফের মাটি বসে যাওয়ায় কাজ পিছিয়ে যায়। প্রায় ৮০ মিটার অংশে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছিল বলে রেল সূত্রে জানা যায়।
তার পর থেকেই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ শুরু করে পূর্ব রেল। পাইলিং, পাথর ও স্টোন ডাস্ট দিয়ে মাটির ভিত শক্ত করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত অংশে রেললাইন ফের বসানোর কাজ চলে। বহু শ্রমিক ও ইঞ্জিনিয়ারকে কাজে নামানো হয়। একাধিক পাইলিং রিগও ব্যবহার করা হয়েছে। রেলের শীর্ষ আধিকারিকেরা ঘটনাস্থলে গিয়ে কাজের অগ্রগতি পরিদর্শন করেছেন।
কিন্তু মেরামতির কাজ চলাকালীন ফের ধস নামায় শুক্রবারও উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়নি। ফলে বাতিল হয়েছে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ দূরপাল্লার ট্রেন। শতাব্দী, বন্দে ভারত, দার্জিলিং মেল, কাঞ্চনকন্যা, পদাতিক, উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেসের মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবাও তার প্রভাবের মুখে পড়ে।
শনিবারের জন্যও বাতিলের তালিকায় রয়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ট্রেন। রেলের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৫ সেপ্টেম্বর যাত্রা শুরুর কথা থাকা নাহারলাগুন–সাঁতরাগাছি স্পেশাল, গুয়াহাটি–হাওড়া সরাইঘাট এক্সপ্রেস, বামনহাট–শিয়ালদহ উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস, আলিপুরদুয়ার–শিয়ালদহ কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস, হলদিবাড়ি–শিয়ালদহ দার্জিলিং মেল, বালুরঘাট–শিয়ালদহ এক্সপ্রেস, নিউ আলিপুরদুয়ার–শিয়ালদহ পদাতিক এক্সপ্রেস, জলপাইগুড়ি রোড–শিয়ালদহ হামসফর এক্সপ্রেস, রাধিকাপুর–কলকাতা এক্সপ্রেস, যোগবাণী–কলকাতা এক্সপ্রেস, কাটিহার–হাওড়া এক্সপ্রেস, রাধিকাপুর–হাওড়া কুলিক এক্সপ্রেস, বালুরঘাট–কলকাতা তেভাগা এক্সপ্রেস, নিউ আলিপুরদুয়ার–শিয়ালদহ তিস্তা-তোর্সা এক্সপ্রেস এবং মালদা টাউন–হাওড়া ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস বাতিল করা হয়েছে।
শুধু দূরপাল্লার ট্রেন নয়, মালদহ টাউন, আজিমগঞ্জ, সাহেবগঞ্জ-সহ বিভিন্ন শাখা রুটেও পরিষেবা ব্যাহত হয়েছে। বাতিল হয়েছে একাধিক প্যাসেঞ্জার ও মেমু ট্রেন। ফলে উত্তরবঙ্গগামী যাত্রীদের পাশাপাশি স্থানীয় যাত্রীদেরও ভোগান্তি চরমে উঠেছে। অন্য দিকে, আটকে পড়া যাত্রীদের কথা মাথায় রেখে সড়কপথেও বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রেল পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার পরে রাজ্য সরকারের তরফে অতিরিক্ত বাস চালানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। উত্তরবঙ্গের সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগ সচল রাখতে শুক্রবার আরও বাস নামানো হয়েছে বলে সরকারি সূত্রে খবর।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বেশ কিছু দূরপাল্লার ট্রেনকে ঘুরপথেও চালানো হয়েছে। নিউ ফরাক্কা–আজিমগঞ্জ–নলহাটি বা কাটিহার–মানসী–মুঙ্গের–কিউলের মতো বিকল্প রুট ব্যবহার করে পরিষেবা সচল রাখার চেষ্টা করেছে রেল। তবে তাতে যাত্রাপথ বেড়েছে, কোথাও কোথাও সময়ও লেগেছে বেশি।
এ বার তাই সবার নজর ফরাক্কার সেই ক্ষতিগ্রস্ত আপ লাইনের দিকে। ইনস্পেকশন কারের পরীক্ষামূলক যাত্রা এবং ধীর গতিতে মালগাড়ি চালিয়ে পরীক্ষা—দু’টি পরীক্ষাতেই যদি ইঞ্জিনিয়াররা সন্তুষ্ট হন, তবেই খুলবে যাত্রীবাহী ট্রেনের পথ। প্রথম দিকে নিরাপত্তার কারণে নিয়ন্ত্রিত গতিতে ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত গতি নিয়ন্ত্রণে রাখার সম্ভাবনাই বেশি।
অর্থাৎ, তিন দিনের উৎকণ্ঠার পরে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের রেল যোগাযোগ ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ফরাক্কার মাটির উপর দিয়ে আবার যাত্রীবাহী ট্রেন ছুটবে কি না, তার চূড়ান্ত সিলমোহর এখনও ইঞ্জিনিয়ারদের রিপোর্টের অপেক্ষায়।