নয়াদিল্লি: জল নিয়ে ভারত-পাকিস্তান সংঘাত এ বার গড়াল আন্তর্জাতিক আদালতের দরজায়। আর সেখান থেকেই এল দিল্লির কড়া প্রত্যাখ্যান। হেগের ‘কোর্ট অব আরবিট্রেশন’ সিন্ধু জলচুক্তি নিয়ে যে রায় দিয়েছে, তার কোনও আইনি বৈধতা ভারত মানে না বলে সোমবার স্পষ্ট জানিয়ে দিল বিদেশ মন্ত্রক। শুধু রায় নয়, ওই আদালতেরই কোনও এখতিয়ার নেই বলেও দাবি করেছে নয়াদিল্লি।
ভারতের বক্তব্য, চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে যে সালিশি সংস্থা তৈরি করা হয়েছে, তার কোনও সিদ্ধান্তই ভারতের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত বা প্রকল্পের উপর প্রভাব ফেলতে পারে না। ভারতের এই অবস্থান এমন এক সময়ে, যখন ১৯৬০ সালের সিন্ধু জলচুক্তিকে ঘিরে দিল্লি-ইসলামাবাদ সম্পর্ক ফের তীব্র টানাপড়েনের মধ্যে। ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল পহেলগামে জঙ্গি হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একাধিক কড়া পদক্ষেপ করেছিল ভারত। তার পরের দিনই সিন্ধু জলচুক্তি ‘স্থগিত’ রাখার সিদ্ধান্ত নেয় নয়াদিল্লি। সেই সিদ্ধান্ত এখনও বহাল রয়েছে বলেই সোমবার ফের জানিয়ে দিয়েছে বিদেশ মন্ত্রক।
কী বলেছে হেগের আদালত?
১৯৬০ সালে বিশ্ব ব্যাঙ্কের মধ্যস্থতায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল সিন্ধু জলচুক্তি। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে দুই দেশের মধ্যে একাধিক যুদ্ধ, সীমান্ত সংঘাত এবং কূটনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যেও চুক্তিটি টিকে ছিল। কিন্তু পহেলগাম হামলার পর সেই দীর্ঘস্থায়ী সমঝোতাতেই বড় ফাটল ধরে।
হেগের সালিশি আদালত সোমবার জানিয়েছে, সিন্ধু জলচুক্তি এখনও কার্যকর এবং ভারত একতরফা ভাবে সেটিকে স্থগিত করতে পারে না। একই সঙ্গে জম্মু ও কাশ্মীরে ভারতের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়েও কিছু অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিয়েছে আদালত। বিশেষ করে রাটলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণকাজের ক্ষেত্রে আপাতত বিধিনিষেধ আরোপের কথা জানিয়েছে তারা। কিন্তু আদালতের এই অবস্থান মানতে নারাজ ভারত।
‘এই আদালতকেই আমরা স্বীকার করি না’
বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য, এই তথাকথিত কোর্ট অব আরবিট্রেশন ‘অবৈধ ভাবে গঠিত’। ভারত কখনও এই সংস্থার আইনি অস্তিত্ব স্বীকার করেনি। বরং শুরু থেকেই বলে এসেছে, একই সঙ্গে কোর্ট অব আরবিট্রেশন এবং নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে একই ধরনের বিরোধের নিষ্পত্তির চেষ্টা সিন্ধু জলচুক্তির কাঠামোর পরিপন্থী।
বিদেশ মন্ত্রকের দাবি, এই আদালত চুক্তির বিধান লঙ্ঘন করে গঠিত হওয়ায় তার কোনও সিদ্ধান্তই ভারতের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক নয়। ফলে সোমবারের রায়ও ভারতের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প কিংবা চুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তে কোনও প্রভাব ফেলবে না। দিল্লির বার্তা আরও স্পষ্ট—সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত রাখার ভারতের সিদ্ধান্ত বহাল রয়েছে। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক সালিশি আদালত এক কথা বললেও ভারত আপাতত নিজের অবস্থান থেকে একচুলও সরছে না।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই চুক্তি?
সিন্ধু নদ ব্যবস্থা শুধু দুই দেশের ভূগোলের অংশ নয়, কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িত। ১৯৬০ সালের চুক্তিতে সিন্ধু নদ-ব্যবস্থার জল ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভারত ও পাকিস্তানের অধিকার ও সীমাবদ্ধতা নির্দিষ্ট করা হয়েছিল। বিশেষ করে পাকিস্তানের কৃষি ও সেচব্যবস্থা এই নদীগুলির জলের উপর ব্যাপক ভাবে নির্ভরশীল। ফলে চুক্তি স্থগিত হওয়ার বিষয়টি ইসলামাবাদের কাছে শুধু কূটনৈতিক সমস্যা নয়, অর্থনীতি ও কৃষির জন্যও বড় উদ্বেগের।
অন্য দিকে, জম্মু ও কাশ্মীরে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রে চুক্তির নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের অসন্তোষের কারণ। রাটলে ও কিশনগঙ্গার মতো প্রকল্পকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে আগেও বিরোধ হয়েছে। সেই বিরোধেরই একটি অংশ এখন আন্তর্জাতিক সালিশির মঞ্চে পৌঁছেছে।
দিল্লি-ইসলামাবাদ সংঘাতের নতুন অধ্যায়?
পহেলগাম হামলার পর ভারত স্পষ্ট করে দিয়েছিল—সন্ত্রাস এবং স্বাভাবিক সম্পর্ক একসঙ্গে চলতে পারে না। সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তও সেই বৃহত্তর কূটনৈতিক অবস্থানের অংশ। পাকিস্তান অবশ্য চুক্তি বহাল রাখার পক্ষে বার বার সওয়াল করেছে।
সোমবারের রায়ের পরে সেই পুরনো বিরোধই আরও এক ধাপ এগোল। এক দিকে হেগের আদালত বলছে, চুক্তি কার্যকর এবং তা একতরফা ভাবে স্থগিত করা যায় না। অন্য দিকে ভারত বলছে, যে আদালতই এই রায় দিয়েছে, তারই কোনও বৈধ এখতিয়ার নেই।
ফলে জল নিয়ে দুই দেশের পুরনো বিবাদ এ বার শুধু নদীর স্রোতে আটকে নেই। তা ঢুকে পড়েছে আন্তর্জাতিক আইন, কূটনীতি এবং সার্বভৌম অধিকারের বিতর্কেও। দিল্লির অবস্থান আপাতত অনড়। বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য, ওই আদালতের বর্তমান বা ভবিষ্যতের কোনও ঘোষণা ভারতের চলমান প্রকল্প বা সার্বভৌম সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে না। অর্থাৎ, হেগের রায় এসেছে। কিন্তু দিল্লির দরজা আপাতত বন্ধই। সিন্ধুর জল নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের পুরনো টানাপড়েন এ বার কোন পথে গড়ায়, নজর থাকবে সেখানেই।