টরন্টো: শুরুটা হয়েছিল সামান্য কিছু বাড়তি টাকা রোজগারের আশায়। কলেজে পড়ার সময় বন্ধুর কথায় প্রথম বার শেয়ারে টাকা ঢেলেছিলেন। একটি বাজি থেকে আচমকা লাভও হয়েছিল। তার পরেই যেন বদলে গেল সব। শেয়ার কেনাবেচা আর শুধু বিনিয়োগ রইল না—পরিণত হল নেশায়। ক্লাস চলাকালীন লুকিয়ে ল্যাপটপে ট্রেডিং, চাকরি ছেড়ে দিনের পর দিন বাজারের ওঠানামা দেখা, এমনকি ট্রেডিংয়ের নেশা কাটাতে বিশেষ চিকিৎসা কেন্দ্রে ভর্তি হয়েও ফের একই জায়গায় ফিরে আসা, শেষ পর্যন্ত প্রায় ৩.৫ লক্ষ কানাডীয় ডলার অর্থাৎ প্রায় ২.৩৯ কোটি টাকা হারালেন কানাডায় বসবাসকারী ভারতীয় বংশোদ্ভূত টেকি অক্ষয় সাপ্রা।
৩১ বছরের অক্ষয় বর্তমানে গ্রেটার টরন্টো এলাকায় থাকেন। তাঁর পরিবারের শিকড় ভারতে। চার বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে কানাডায় চলে যান তিনি। শুরুতে তাঁর পরিবারকে নানা রকম কাজ করে দিন কাটাতে হয়েছিল। পরে তাঁর বাবা কেলোনায় একটি পশু চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তোলেন। আর্থিক ভাবে পরিবার কিছুটা স্বচ্ছল হলেও ছোটবেলার অভিজ্ঞতা অক্ষয়ের মধ্যে ‘অভাবের মানসিকতা’ তৈরি করেছিল বলে তাঁর দাবি। সেই মানসিকতাই পরবর্তী সময়ে আরও বেশি টাকা করার তাড়নাকে উস্কে দিয়েছিল বলে মনে করেন তিনি।
২০১৭ সালে কলেজে পড়ার সময় শেয়ার বাজারে প্রথম পা। এক বন্ধু তাঁকে বলেছিলেন, কানাডায় গাঁজা বৈধ হতে চলেছে। সেই সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে অক্ষয় কয়েকটি ‘মারিজুয়ানা স্টক’ কিনেছিলেন। দাম বাড়লেও খুব বড় অঙ্কের লাভ হয়নি। কিন্তু সেখানেই শুরু। লাভের আশায় অল্প সময়ের মধ্যে বার বার শেয়ার কেনা-বেচা করতে শুরু করেন তিনি। অক্ষয়ের কথায়, তখন প্রতি ট্রেডে প্রায় ১০ ডলার খরচ হলেও তিনি নিজেকে থামাতে পারতেন না। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস চলার সময়ও ল্যাপটপ খুলে ট্রেড করতেন
অক্ষয়ের নিজের ভাষায়, তিনি খুব তাড়াতাড়িই বুঝেছিলেন যে তাঁর ধৈর্য কম। দীর্ঘ সময় ধরে বিনিয়োগ রেখে ধীরে ধীরে সম্পদ বাড়ানোর মানসিকতা তাঁর ছিল না। বাজারে দ্রুত লাভ করার তাড়াই তাঁকে বার বার ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিত। কলেজের বিভিন্ন কাজ ও ইন্টার্নশিপ থেকে পাওয়া টাকাও সেই সময় বাজারে হারিয়েছিলেন তিনি।পড়াশোনা শেষ করে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি পান অক্ষয়। মনে হয়েছিল, এবার হয়তো জীবনে স্থিরতা আসবে। কিন্তু শেয়ার বাজার তাঁকে ফের টেনে নেয়। আর সেই ফেরার মোড়ে ছিল মেটা-কে ঘিরে একটি বড় বাজি।
এক দিন মেটা-র আর্থিক ফল প্রকাশের আগে তিনি বাজি ধরেন, সংস্থার শেয়ারের দাম পড়বে। তাঁর অনুমান মিলে যায়। অল্প সময়েই বড় অঙ্কের লাভ। সেই সাফল্য তাঁকে উচ্ছ্বসিত করে তোলে। লাভের টাকা দিয়ে নিজের জন্য দামি একটি মার্টিনি কিনেছিলেন, যা তাঁর জীবনে আগে কখনও করেননি। সেই মুহূর্তটি যেন আরও বড় ঝুঁকি নেওয়ার আত্মবিশ্বাস জোগায়। তার পরের চার বছর ছিল ওঠানামার। কখনও বিপুল লাভ, কখনও ভয়াবহ ক্ষতি। কিন্তু ক্ষতি হলেই থেমে যাওয়ার বদলে আরও বেশি ট্রেড করে আগের টাকা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করতেন অক্ষয়। ধীরে ধীরে ট্রেডিং তাঁর জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে শেষ পর্যন্ত সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের চাকরিও ছেড়ে দেন তিনি। পূর্ণ সময়ের চাকরির বদলে কখনও উবরের হয়ে ডেলিভারি করতেন, আর বাকি সময় চলে যেত শেয়ার বাজারের পিছনে। নেশা কাটাতে চিকিৎসা কেন্দ্রে গেলেও লাভ হয়নি। অক্ষয় জানান, ট্রেডিংয়ের অভ্যাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে তাঁকে তিন সপ্তাহের একটি জুয়া-নির্ভরতা নিরাময় কর্মসূচিতে যেতে হয়েছিল। সেখানে ফোন ব্যবহারের সুযোগও ছিল না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তাঁর তৈরি করা ট্রেডিং বট তখনও বাজারে লেনদেন চালিয়ে যাচ্ছিল। চিকিৎসা শেষ করে বাইরে বেরোনোর পর অন্য অংশগ্রহণকারীদের ভবিষ্যদ্বাণীই সত্যি হয়, অক্ষয় ফের ট্রেডিংয়ে ফিরে যান।
এর পর আসে আরও বড় ঝুঁকি। SpaceX-কে ঘিরে বড় অঙ্কের বাজি ধরেছিলেন অক্ষয়। তাঁর হিসাব মেলেনি। মাত্র এক মাসের মধ্যে তিনি কখনও ৩ লক্ষ ডলার লাভ করেছেন, আবার সেই টাকা হারিয়েছেন; শেষে ক্ষতির অঙ্ক দাঁড়ায় ৩.৫ লক্ষ কানাডীয় ডলারের বেশি। ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ২.৩৯ কোটি টাকা। তবু অক্ষয়ের গল্পের শেষ এখানেই নয়। এত বড় ক্ষতির পরেও তিনি পুরোপুরি ট্রেডিং ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেননি। বরং নিজের প্রতিটি ট্রেড প্রকাশ্যে নথিবদ্ধ করতে একটি ইউটিউব চ্যানেল শুরু করার পরিকল্পনা করছেন। তাঁর আশা, প্রকাশ্যে নিজের লেনদেনের হিসাব রাখলে হয়তো নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
অক্ষয়ের অভিজ্ঞতা অবশ্য শুধু এক জন টেকির বিপুল টাকা হারানোর গল্প নয়। বরং বিনিয়োগ আর জুয়াসদৃশ ট্রেডিংয়ের মধ্যে সীমারেখা কতটা দ্রুত মুছে যেতে পারে, তারও সতর্কবার্তা। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের বদলে অল্প সময়ে দাম ওঠানামা থেকে লাভ করার নেশা যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন বড় বেতন বা প্রযুক্তিক্ষেত্রে সফল কেরিয়ারও আর্থিক বিপর্যয় ঠেকাতে পারে না।
অক্ষয়ের নিজের উপলব্ধিটাও তাই যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। বড় অঙ্কের টাকা হারানোর পরেও অনেক সময় হাতে থাকা টাকাকে আর সম্পদ বলে মনে হয় না, বরং মনে হয়, ‘আরও বেশি টাকা থাকা উচিত ছিল’। সেই মানসিকতাই মানুষকে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশায় আরও বড় ঝুঁকি নিতে বাধ্য করে। ২.৩৯ কোটি টাকার ক্ষতি তাই শুধু একটি সংখ্যার গল্প নয়, এটি এক জন মানুষের ‘আর একটু লাভ’-এর পিছনে ছুটতে ছুটতে কোথায় পৌঁছে যাওয়ার গল্প।