নয়াদিল্লি: ভারতের রেল মানচিত্রে এমন এক অদ্ভুত হিসাব সামনে এসেছে, যা চোখে পড়ার মতো। দেশের রেল নেটওয়ার্কের মাত্র ১৬ শতাংশ পথে সামলাতে হচ্ছে মোট রেল চলাচলের প্রায় ৪১ শতাংশ। অর্থাৎ, রেলের বিশাল জাল ছড়িয়ে থাকলেও যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেনের সিংহভাগ চাপ এসে পড়েছে কয়েকটি নির্দিষ্ট ‘হাই ডেনসিটি’ পথে। কোথাও ট্রেনের পর ট্রেন, তার মাঝেই মালগাড়ি। একটি ট্রেন সামান্য দেরি করলেই তার প্রভাব গিয়ে পড়ছে পরের একাধিক ট্রেনের উপরে।
এই চাপ কমাতেই এ বার বড়সড় পরিকাঠামো বদলের পথে ভারতীয় রেল। দেশের সাতটি গুরুত্বপূর্ণ উচ্চ-ঘনত্বের রেল করিডরকে চার লাইনের করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১১ হাজার কিলোমিটার রেলপথে বাড়বে ট্র্যাকের সংখ্যা। লক্ষ্য একটাই—একই পথে আরও বেশি ট্রেন চালানো, যাত্রী ও পণ্য পরিবহণের ক্ষমতা বাড়ানো এবং ব্যস্ত রুটে জট কমানো।
পরিকল্পনার তালিকায় রয়েছে দিল্লি-হাওড়া, হাওড়া-চেন্নাই, চেন্নাই-মুম্বই, মুম্বই-দিল্লি, দিল্লি-চেন্নাই, মুম্বই-হাওড়া এবং দিল্লি-গুয়াহাটি—দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাতটি রেলপথ। অর্থাৎ, দেশের উত্তর থেকে পূর্ব, পশ্চিম থেকে দক্ষিণ—অর্থনীতি ও জনজীবনের প্রধান অক্ষগুলির উপরেই পড়ছে এই সম্প্রসারণের জোর।
হাওড়ার গুরুত্ব আরও বাড়বে
তালিকায় হাওড়ার নাম দু’বার। এক দিকে দিল্লি-হাওড়া, অন্য দিকে হাওড়া-চেন্নাই এবং মুম্বই-হাওড়া করিডর। ফলে পূর্ব ভারতের রেল যোগাযোগের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হাওড়া এই পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দিল্লি-হাওড়া পথের উপর প্রতিদিনই বিপুল সংখ্যক যাত্রী এবং মালবাহী ট্রেন নির্ভরশীল।
এই পথে প্রতিদিন ১২০-র বেশি যাত্রীবাহী এবং প্রায় ১০০টি মালগাড়ি চলাচল করে বলে রেল সূত্রের তথ্য। দিল্লি-হাওড়া করিডরের দৈর্ঘ্য প্রায় ১,৪০০ কিলোমিটার। দিল্লি-মুম্বই পথও প্রায় ১,৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং সেখানে প্রতিদিন ৯০টির বেশি যাত্রীবাহী ট্রেনের পাশাপাশি প্রায় ৮০-৮৫টি মালগাড়ি চলে।
এই হিসাবই বোঝাচ্ছে, একই লাইনে যাত্রীবাহী ট্রেনের সঙ্গে মালগাড়ির চাপ কতটা। একটি রুটে লাইনের সংখ্যা বাড়লে শুধু ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানোই নয়, ট্রেনগুলিকে আলাদা ভাবে পরিচালনা করার সুযোগও বাড়বে। ফলে একটি ট্রেনের পিছনে অন্য ট্রেনকে দীর্ঘ সময় দাঁড় করিয়ে রাখার প্রয়োজন কমতে পারে।
এক লাইনের উপর এত চাপ কেন?
রেলের পরিভাষায় এই সাতটি পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হাই ডেনসিটি নেটওয়ার্ক’। দেশের সবচেয়ে বড় শহর, শিল্পাঞ্চল, বন্দর, বাণিজ্যকেন্দ্র এবং জনবহুল অঞ্চলগুলিকে তারা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে। এই পথগুলির উপর চাপের একটি বড় কারণ পণ্য পরিবহণও। দেশের শিল্প ও বাণিজ্যের জন্য কয়লা, ইস্পাত, সিমেন্ট, খাদ্যশস্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিল্পপণ্য রেলের মাধ্যমে পরিবহণ করা হয়। একই সময়ে ছুটছে দূরপাল্লার এক্সপ্রেস, সুপারফাস্ট, বন্দে ভারত-সহ বিভিন্ন যাত্রীবাহী ট্রেন।
ফলে একই লাইনে যাত্রী এবং পণ্য—দুই ধরনের পরিবহণের চাপ। লাইন বাড়ানোর ফলে সেই চাপ ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
শুধু বেশি ট্রেন নয়, কমতে পারে অপেক্ষাও
চার লাইন মানেই যে সঙ্গে সঙ্গে সব ট্রেনের গতি দ্বিগুণ হয়ে যাবে, তা নয়। কিন্তু রেলের ধারণক্ষমতা বাড়লে একটি ব্যস্ত করিডরে ট্রেন চালানোর সময়সূচি আরও নমনীয় করা সম্ভব হবে। একটি ট্রেনকে অন্যটির জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করিয়ে রাখার প্রয়োজন কমবে। পণ্যবাহী ট্রেনের চলাচলও আরও পরিকল্পিত ভাবে করা যাবে।
দিল্লি-হাওড়া এবং দিল্লি-মুম্বইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ রুটে ইতিমধ্যেই ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত গতিতে এক্সপ্রেস ট্রেন চালানোর পরিকাঠামো তৈরির কাজ চলছে। ফলে ট্র্যাকের সংখ্যা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দ্রুতগতির ট্রেন চালানোর পরিকল্পনাও আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হবে।
চেন্নাই-হাওড়া, দিল্লি-চেন্নাইও নজরে
তালিকার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হাওড়া-চেন্নাই করিডর। প্রায় ১,৬৫৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথ পূর্ব ও দক্ষিণ ভারতের মধ্যে অন্যতম প্রধান সংযোগ। অন্য দিকে দিল্লি-চেন্নাই করিডর প্রায় ২,১৭৪ কিলোমিটার দীর্ঘ। চেন্নাই-মুম্বই পথ প্রায় ১,২৮৯ কিলোমিটার। অর্থাৎ, প্রকল্পটি কোনও একটি রাজ্য বা শহরকেন্দ্রিক নয়। দেশের চার প্রান্তের প্রধান অর্থনৈতিক করিডরগুলিকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই এই পরিকল্পনা।
রেলপথ বাড়ছে, চাপও বাড়ছে
ভারতীয় রেলে প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার ট্রেন চলাচল করে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারতীয় রেল ৭৪১ কোটিরও বেশি যাত্রী পরিবহণ করেছে। ফলে আগামী দিনে যাত্রীসংখ্যা এবং পণ্য পরিবহণ আরও বাড়বে—এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই পরিকাঠামো বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
রেলের কাছে তাই প্রশ্নটা এখন শুধু ‘কতগুলি ট্রেন চালানো যাবে’ নয়। প্রশ্ন হল—একই সঙ্গে দ্রুত, নিরাপদ এবং নির্ভরযোগ্য ভাবে কতগুলি ট্রেন চালানো সম্ভব? সেখানেই চার লাইনের পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ। দুটি লাইন থাকলে একটি ট্রেনের সামনে অন্য ট্রেন থাকলেই গতি কমাতে হয়, কখনও লুপ লাইনে দাঁড় করাতে হয়। চারটি লাইন থাকলে যাত্রীবাহী এবং মালবাহী ট্রেনের চলাচল আলাদা ভাবে পরিকল্পনা করার সুযোগ বাড়ে। রেলপথের ‘ক্ষমতা’ও তাই শুধু ট্র্যাকের দৈর্ঘ্যে মাপা যায় না—একই সময়ে কতগুলি ট্রেনকে কতটা দক্ষতার সঙ্গে চালানো যাচ্ছে, সেটিই আসল।
দেশের রেল-মানচিত্রে বড় বদলের ইঙ্গিত
ভারতীয় রেলের এই পরিকল্পনা আসলে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। এত দিন নতুন রেললাইন পৌঁছনো ছিল প্রধান লক্ষ্য। এখন ব্যস্ত রুটে একই পরিকাঠামোর ক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়ানো আরও বড় প্রয়োজন হয়ে উঠছে। এক দিকে নতুন শহর, নতুন শিল্পাঞ্চল, নতুন বন্দর এবং নতুন অর্থনৈতিক কেন্দ্র তৈরি হচ্ছে। অন্য দিকে সাধারণ মানুষের রেলযাত্রার চাহিদাও বাড়ছে।
সেই চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে হলে শুধু নতুন ট্রেন ঘোষণা করলেই হবে না, প্রয়োজন নতুন ট্র্যাক। সেই কারণেই ১১ হাজার কিলোমিটার পথের এই চার-লাইনের পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ। আজ যে ১৬ শতাংশ রেলপথ দেশের ৪১ শতাংশ রেল চলাচলের ভার বইছে, আগামী দিনের ভারত সেখানে আরও বেশি ট্রেন চালাতে চাইছে।রেললাইনের সংখ্যা বাড়িয়ে তাই শুধু জট কমানোর চেষ্টা নয়—ভারতের অর্থনীতি ও যাত্রার গতিকেই আরও দ্রুত করার প্রস্তুতি।