বিশ্বদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: কেরলকে বলা হয় ‘ভগবানের আপন দেশ’। কথাটা যে নিছক পর্যটন-প্রচারের বুলি নয়, তা বোঝা যায় এই রাজ্যের পথে পা রাখলেই। আর বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের জানলার ধারে বসে কেরলের কাঞ্চিকোড়ের বুক চিরে এগোতে এগোতে সেই অনুভূতিটাই যেন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। একের পর এক সবুজ পাহাড়, দূরে নীল আকাশ, কোথাও ঘন জঙ্গল। সব মিলিয়ে মনে হয়, ট্রেন নয়, যেন আমরা ছুটে চলেছি কোনও ছবির ভিতর দিয়ে।
রাজধানী তিরুবনন্তপুরমকেও (তৎকালীন ত্রিবান্দ্রম) জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী অভিহিত করেছিলেন "ভারতের চিরসবুজ শহর" বলে। যদিও কেরল মানে শুধুই প্রকৃতি নয়। তিরুবনন্তপুরমের শ্রী পদ্মনাভস্বামী মন্দির এই রাজ্যের ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিকতার অন্যতম প্রতীক।
বিশ্বের অন্যতম ধনী এই হিন্দু মন্দিরে অনন্তনাগ বা শেষনাগের উপর যোগনিদ্রায় শায়িত ভগবান বিষ্ণুর অপূর্ব বিগ্রহকে ঘিরে রয়েছে বহু কিংবদন্তি, রহস্য এবং ইতিহাস। মন্দিরের স্থাপত্যও মুগ্ধ করে দর্শনার্থীদের। তবে নিজের আপন দেশে ভগবানের আসল মায়া যেন ছড়িয়ে রয়েছে প্রকৃতির আনাচে-কানাচেই।
এক দিকে নীল সমুদ্র। অন্য দিকে পশ্চিমঘাটের সবুজ পাহাড়। আর মাঝখানে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা জলপথ—কেরলের বিখ্যাত ব্যাকওয়াটার। যেখানে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ হাউসবোট বা ‘কেট্টুভাল্লম’—ভাসমান বাড়ির মতো এই নৌকায় থাকে শোবার ঘর, বাথরুম ও রান্নাঘর।
এ ছাড়া কম খরচে ঘোরার জন্য রয়েছে শিকারা ও মোটর বোট। স্থানীয়দের জন্য রয়েছে সরকারি ওয়াটার ট্যাক্সি ও ফেরি। আর ওনাম উৎসবের নৌকা বাইচে, যেমন নেহেরু ট্রফিতে, দেখা মেলে ঐতিহ্যবাহী ‘চুন্দন ভাল্লম’ বা সাপ নৌকার। সব মিলিয়ে এই ব্যাকওয়াটার সফরের অভিজ্ঞতা যেমন আলাদা, তেমনই পাহাড়ি পথে ট্রেনযাত্রার রোমাঞ্চও কম নয়।
কেরলের পাহাড়ি সৌন্দর্যের কথা উঠলেই প্রথম সারিতে আসে মুন্নার, ওয়ায়নাড, ইদুক্কি এবং পোনমুদি। চা-বাগান, কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়, জলপ্রপাত আর ঘন সবুজে মোড়া এই হিল স্টেশনগুলি প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে যেন একেকটি জীবন্ত পোস্টকার্ড। দক্ষিণ ভারতের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ আনাইমুদি-ও রয়েছে মুন্নারে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,৬৯৫ মিটার উঁচু এই শৃঙ্গ পশ্চিমঘাটের সৌন্দর্যকে আরও মহিমান্বিত করেছে।
আজকের পৃথিবীটা ছোট হতে হতে বন্দি হয়ে গিয়েছে মুঠোফোনের ছোট্ট পর্দায়। ফেসবুক, ইউটিউবের দৌলতে ঘরে বসেই মুহূর্তে পৌছে যাওয়া যায় পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে। কিন্তু কেরলকে শুধু পর্দায় দেখলে তার আসল মায়া ধরা পড়বে কখনওই। বন্দে ভারতের জানলা দিয়ে যখন পাহাড়, সবুজ আর নীলের মেলবন্ধন চোখের সামনে ধরা দেয়, তখন উত্তরটা নিজেই মেলে। সত্যিই যেন সেই মুহূর্তে মনে হয়—ট্রেনের কামরায় নয়, বুঝি পৌঁছে গিয়েছি ভগবানের নিজের দেশে।